প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকারি অফিসে শিক্ষা কর্মকর্তার জন্মদিন, শিক্ষকদের উপঢৌকন দেওয়ার অভিযোগ

উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : হাতিয়ায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে প্রায় শতাধিক শিক্ষককে নিয়ে নিজের জন্মদিন পালনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আ. জব্বারের বিরুদ্ধে। অনুষ্ঠানে কেক কাটার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে পোশাকসহ উপঢৌকন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি সরকারি অফিসে এমন আয়োজনের শিষ্টাচার ও চাকরিবিধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে এ জন্মদিনের আয়োজন করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা যায়, শিক্ষক-কর্মচারীরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আ. জব্বারকে কেক খাওয়াচ্ছেন, মোমবাতি জ্বালিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এবং দলবদ্ধভাবে তার হাতে বিভিন্ন প্যাকেট তুলে দিচ্ছেন।এর আগের দিন ১৫ সেপ্টেম্বর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জন্মদিন উপলক্ষে একটি স্বরচিত কবিতা পোস্ট করেন আ. জব্বার। ওই পোস্টের পরই শিক্ষকদের মধ্যে জন্মদিনের আয়োজন নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বলে দাবি কয়েকজন শিক্ষকের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, জন্মদিন উপলক্ষে তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তাদের ভাষ্য, ওই অর্থ দিয়ে কর্মকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য শার্ট, প্যান্ট, ব্লেজার, শাড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী কেনা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একজন শিক্ষক বলেন, “কর্মকর্তার অধীনে চাকরি করি। সরাসরি না বললেও এ ধরনের আয়োজনে অংশ না নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছেন।”

জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আ. জব্বার ও অফিসের উচ্চমান সহকারী নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে পুরোনো বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও সামনে এনেছেন কয়েকজন শিক্ষক ও সাবেক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা।

তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—শিক্ষক বদলি ও ডেপুটেশনে অনিয়ম, বিদ্যালয় পরিদর্শনে অনিয়ম, অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া, সরকারি নথি গোপন, স্মারক জালিয়াতি, ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন, শিক্ষকের বেতন বন্ধ রাখা এবং বিভিন্ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিম্নধাপের বেতনভোগী শিক্ষকদের বকেয়া বিল ছাড় করার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিবেদকের হাতে থাকা নথিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর অধিদপ্তরের একটি আদেশে আ. জব্বারকে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৫ নভেম্বর ওই আদেশ বাতিল হয়ে তিনি আগের পদেই বহাল থাকেন।বদলি আদেশ কেন বাতিল হয়েছিল এবং এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক কারণ ছিল কি না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

তাদের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথা বলে আ. জব্বার নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের দাবি করতেন। তবে এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক নূরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোনে জানান, তিনি ব্যস্ত আছেন এবং পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন।

অধিদপ্তরের তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখায় কর্মরত সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আজমীরা খাতুন বলেন, “আ. জব্বারকে আমি চিনি না। আমাদের কাছে যখন যে কাজ আসে, আমরা সে কাজ করি। এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) ইসরাত নাসিমা হাবীবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

‘চাকরিবিধির প্রশ্ন আছে’সরকারি অফিসে শিক্ষকদের নিয়ে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত জন্মদিন পালনের বিষয়টিকে প্রশাসনিক শিষ্টাচারের দৃষ্টিতে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক তোফায়েল হোসেন এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আ.ন.ম. হাসানের মতে, শ্রেণিকালীন সময়ে শিক্ষকদের সরকারি অফিসে এনে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে যুক্ত করা হলে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও দাপ্তরিক দায়িত্বের বিষয়টিও এখানে বিবেচনায় আসা উচিত।

তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে দেখার দাবি জানান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. আ. জব্বারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা ছোটখাটো বিষয়। শিক্ষকদের ভালো লেগেছে—তাই তারা আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠান করেছে।”শিক্ষকদের কাছ থেকে উপঢৌকন নেওয়া, অর্থ সংগ্রহ, পুরোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং বদলি আদেশ বাতিলের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দেননি।

সরকারি দপ্তরে ব্যক্তিগত জন্মদিন আয়োজন, শিক্ষকদের অংশগ্রহণ এবং উপঢৌকন দেওয়ার অভিযোগ—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে পুরোনো অভিযোগগুলোর কোনোটি সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর