প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৭ নভেম্বর, ২০২৬

শ্রমিক আন্দোলনের এক কিংবদন্তি নেতা কমরেড আবুল বাশার

নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড আবুল বাশার এক অবিস্মরণীয় নাম। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আজীবন ভূমিকা রেখেছেন। শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য ও মুক্তির আন্দোলনে তাঁর অবদান তাঁকে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ও কিংবদন্তি নেতায় পরিণত করেছে।

১৯৩৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন নোয়াখালী জেলার বর্তমান লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কেরোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবুল বাশার। তাঁর বাবা নুরুজ্জামান পণ্ডিত এবং মা আনোয়ারা খাতুন। ছাত্রজীবন থেকেই জমিদারি প্রথাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের সূচনা হয়।

১৯৫৩ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে কালুরঘাটের চিটাগাং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন। শ্রমিকদের অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। শ্রমিকদের কাছে পরিচিতি পান ‘মাস্টার’ নামে। পরবর্তী সময়ে শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে চাকরিচ্যুত হতে হলেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি।

পাকিস্তান আমলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সাহসী নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৬-৫৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। এরপরও তিনি ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে যোগ দেন এবং ভাসানী ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আত্মগোপনে থেকেও শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেন।

১৯৬১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ১৫ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৪ সালের জুলাইয়ে পুনরায় গ্রেপ্তার হলে তাঁর মুক্তির দাবিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাটকলসহ শিল্পাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কোর্টহিল ও কারাগার ঘেরাও করেন। শ্রমিকদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ঘটনাটি তৎকালীন শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৬০-এর দশকে পাটকল, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শিল্প খাতের শ্রমিক আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৬৮ সালে পাটকল শ্রমিকদের ২১ দিনের ধর্মঘটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও শ্রমিকদের সংগঠিত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রশ্নেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ছয় দফা বনাম পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তির আন্দোলন’ গ্রন্থে জাতীয় মুক্তি ও শ্রেণিসংগ্রামের সম্পর্ক এবং পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মেধা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের বহু নেতাকর্মী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন গঠিত হলে তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। দেশের বিভিন্ন শিল্প ও শ্রম খাতের শ্রমিকদের একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে শ্রমিক আন্দোলনে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। আশির দশকে বাংলাদেশের মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেন এবং ১৫ দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৮৫ সালের ১৭-১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি গঠিত হলে তিনি দলটির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি।

শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শ্রমিকদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘আমাদের কমরেড বাশার’ নামে। একজন শ্রমিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর জীবন ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।

২০১০ সালের ৭ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে শ্রমিকের অধিকার, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির প্রশ্নে তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম আজও প্রাসঙ্গিক।

কমরেড আবুল বাশারের জীবন ও রাজনৈতিক কর্মধারা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রামে তাঁর অবদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শ্রমিক আন্দোলনের এই কিংবদন্তি নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর