
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া : হাতিয়া উপজেলায় হঠাৎ দেখা দেওয়া পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সংকটে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে স্থানীয় যাতায়াত ব্যবস্থা। জ্বালানি সংকটের কারণে ভাড়ায় চালিত কয়েকশ মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চালকরা। অন্যদিকে দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরাও।
দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় হাতিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই মোটরসাইকেল সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসার যানবাহন। উপজেলার বিভিন্ন ঘাট, বাজার ও গ্রামীণ সড়কে প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করেন চালকরা।
স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষও দৈনন্দিন যাতায়াতে এই মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত মার্কেটিং কর্মকর্তা এসআর ও এমআরদের কাজও অনেকটাই মোটরসাইকেলনির্ভর।
কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে উপজেলায় পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় অনেক চালক বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ঘরে রেখে বেকার সময় কাটাচ্ছেন। প্রতিদিন তেলের দোকানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
চালকদের অভিযোগ, কয়েকদিন আগেও যেখানে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল প্রায় ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ থেকে ১৯০ টাকায়। তাও আবার সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।চালকেরা আর অভিযোগ করে কিছু কিছু দোকানে তেল লুকিয়ে রাখে, দাম বেশি ফেলে বিক্রি করে,এই সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে।
স্থানীয় মোটরসাইকেল চালক মো. রবিন বলেন, সারাদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে যা আয় করি তাই দিয়ে সংসার চলে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে তেল না থাকায় গাড়ি বের করতে পারছি না। সামনে ঈদ, অথচ পরিবারের জন্য বাজার করার মতো টাকাও হাতে নেই। ঘরে বসে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
আরেক চালক মো. সোহেল বলেন, হাতিয়ায় মোটরসাইকেলই মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু তেল না থাকায় যাত্রী তুলতে পারছি না। আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এটা খুব বড় সংকট। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।
যাত্রী আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন, জরুরি প্রয়োজনে স্বল্প সময়ে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় আমরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। যানবাহন কমে যাওয়ায় সময়মতো কোথাও যেতে পারছি না, ফলে গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রোগী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।
এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে সাধারণ যাত্রীরাও পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। জরুরি প্রয়োজনে অনেককে দীর্ঘ পথ হেঁটে অথবা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প যানবাহনে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
হাতিয়ার প্রাণকেন্দ্র ওছখালীর তেল ব্যবসায়ী হাজী আব্দুল কুদ্দুস স্টোরের পরিচালক মাহের জানান, জ্বালানি তেলের সরবরাহ কয়েকদিন ধরে স্বাভাবিক নেই। ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না আসায় চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি না। এতে আমাদের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন।
হাতিয়ার আফাজিয়ার জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী ও পদ্মা অয়েল কোম্পানির এক ডিলার বলেন, বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্পিডবোটসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল কমে যাওয়ায় যাত্রী পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
তিনি আরও বলেন, তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে ঘাটকেন্দ্রিক শত শত শ্রমিক, নৌযান শ্রমিক, হাজারো মোটরসাইকেল চালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
এ পরিস্থিতিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দ্রুত এই সংকট নিরসনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ভুক্তভোগী মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রীরা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে হাতিয়ার হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :