• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩১ মার্চ, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৩১ মার্চ, ২০২৬

ভাঙনের আতঙ্কে নিঃস্ব হাতিয়া

সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া :

মেঘনা নদী আর হাতিয়া—একদিকে জীবনের উৎস, অন্যদিকে ধ্বংসের নির্মম প্রতীক। যে নদী একসময় আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল, আজ সেই নদীই কেড়ে নিচ্ছে মানুষের ঘর, জমি, স্বপ্ন—সবকিছু।

প্রতিদিন ভোরে আতঙ্ক নিয়ে ঘুম ভাঙে হাতিয়ার মানুষের। ঘরটা থাকবে তো? নাকি রাতের অন্ধকারেই নদী গিলে নিয়েছে সব? এই অনিশ্চয়তাই এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। গভীর রাতে ভেসে আসে ভাঙনের বিকট গর্জন, আর মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যায় বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর।

বছরের পর বছর ধরে গড়া সংসার, বুকভরা স্বপ্ন আর পূর্বপুরুষের স্মৃতি—সবকিছু নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে দেখে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক হয়ে।

ভাঙনপ্রবণ ইউনিয়ন—হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা, বুড়িরচর, সোনাদিয়া ও নিঝুমদ্বীপ—এখন শুধু মানচিত্রের নাম নয়, হয়ে উঠেছে কান্না আর বেদনার প্রতীক।

পাশাপাশি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরগাসিয়া, ডালচর, চরকাদিরা, চর ওসমান, পাতারচর, চরকালাম ও দমারচর প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এসব এলাকায় নেই স্থায়ী বাঁধ, নেই নিরাপদ আশ্রয়—নদীভাঙন আর জোয়ারের পানির সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচতে হচ্ছে মানুষকে।

স্বাধীনতার পর থেকে মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে হাতিয়ার সুখচর, নলচিরা ও চানন্দী ইউনিয়নের বিশাল এলাকা নদীগর্ভে বিলীন গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, এই সময়ে কয়েক হাজার ঘরবাড়ির পাশাপাশি শত শত বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও মসজিদ বিলীন হয়েছে।

বর্তমানে নলচিরা, সুখচর ও চানন্দী ইউনিয়নকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অংশের ইউনিয়নগুলোই সবচেয়ে বেশি ভাঙনের মুখে।

নদীভাঙনের প্রভাব শুধু বসতভিটায় নয়—আঘাত হানছে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও। গত কয়েক বছরে অন্তত দশটির বেশি সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

বর্তমানে আরও অন্তত ৩টি বিদ্যালয়—জনতাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফরিদপুর বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হেমায়েতপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলো যেকোনো সময় নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাও রক্ষা পাচ্ছে না। চানন্দী ইউনিয়নের ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসা ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে শত শত শিশুর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

মানুষের কান্না, রাষ্ট্রের অপেক্ষা—অনেক পরিবার রাতের আঁধারে সন্তানকে কোলে নিয়ে ছুটে গেছে বেড়িবাঁধে কিংবা উঁচু স্থানে। কারও মাথার ওপর পলিথিন, কারও খোলা আকাশ—এইভাবেই কাটছে সর্বস্ব হারানো মানুষের দিন-রাত।

ভাঙনের শিকার নলচিরা ইউনিয়নের কলাডাংগা গ্রামের বৃদ্ধ নুরুল ইসলাম কাঁপা গলায় বলেন,
“এই ঘরেই আমার জন্ম, এখানেই আমার বিয়ে। নদী সব নিয়ে গেছে। এখন মরার জায়গাটাও নেই।”

তার ভাষায়, নদীভাঙন শুধু ঘরবাড়ি নয়—কেড়ে নিচ্ছে মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ।

সুখচর ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিবার নির্বাচন এলেই বিভিন্ন দলের নেতারা আমাদের এলাকায় আসেন, বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন, মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনেন এবং ছবি তুলে চলে যান। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই আমরা আবার আগের মতোই অবহেলিত থেকে যাই। আমাদের জীবনের বাস্তব কষ্ট, নদীভাঙনের ভয় আর অনিশ্চয়তা—এসবের কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। বছরের পর বছর আমরা শুধু আশ্বাসই শুনে যাচ্ছি।”

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের নামার বাজারের বাসিন্দা সাহেদ উদ্দিন বলেন, “আমরা আর সাময়িক ত্রাণ বা সহানুভূতি চাই না। দুর্যোগের সময় কিছু চাল-ডাল দিয়ে আমাদের জীবন চলে না। আমরা চাই এমন একটি স্থায়ী সমাধান, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপত্তা দেবে। টেকসই ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং কার্যকর নদীশাসন ছাড়া এই এলাকার মানুষকে বাঁচানো সম্ভব নয়। সরকার যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে নিঝুমদ্বীপ একদিন মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে।”

সোনাদিয়া এলাকার আবদুল মান্নান বলেন,
“নদী আমাদের জমি, ঘরবাড়ি—সবকিছু ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। প্রতিদিন আমরা আতঙ্ক নিয়ে ঘুমাতে যাই, সকালে উঠে দেখি হয়তো আরও কিছু ভেঙে গেছে। এই অবস্থায় একা একা টিকে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ছাড়া আমরা এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারব না। এখন প্রয়োজন দ্রুত পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং আমাদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নেওয়া উদ্যোগগুলো কার্যত অপ্রতুল ও অস্থায়ী। জিওব্যাগ ফেলা বা অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মতো পদক্ষেপগুলো প্রথমদিকে কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও, মেঘনার তীব্র স্রোত ও ভাঙনের চাপে সেগুলো বেশিদিন টিকতে পারছে না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে যাচ্ছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আবারও নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, নদীভাঙন রোধে জরুরি করণীয়:

১. টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ: কংক্রিট ব্লক, জিও-টেক্সটাইলসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার।
২. নদী ড্রেজিং: নিয়মিত ড্রেজিং করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা; অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা।
৩. সবুজ বেষ্টনী: কেওড়া, বাইনসহ লবণসহিষ্ণু গাছ লাগানো।
৪. বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা: নদীর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন।
৫. পুনর্বাসন: আগাম সতর্কতা, দ্রুত পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা।
৬. সতর্কীকরণ ব্যবস্থা: প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস চালু করা।
৭. জনগণের সম্পৃক্ততা: স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি।
৮. দখল রোধ: নদীতীর দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ।
৯. সমন্বয়: সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।
১০. গবেষণা: তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
১১. জরুরি তহবিল: দ্রুত পদক্ষেপের জন্য তহবিল গঠন।
১২. অবকাঠামো: ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর।

হাতিয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নদীভাঙন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে—একদিন হয়তো মেঘনার বুকে শুধু ঢেউ থাকবে, মানুষের বসতি থাকবে না। হয়তো মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে ‘হাতিয়া’ নামটি।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর