
শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের নাম নয়; এটি মানুষের চিন্তাশক্তি, বিচারবোধ ও মানবিকতা বিকাশের প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের সমাজে শিক্ষার এই মৌলিক উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা পড়ছি, শিখছি, পরীক্ষায় ভালো ফল করছি।কিন্তু প্রশ্ন করছি না, বুঝতে চাইছি না। ফলে শিক্ষা হয়ে উঠছে যান্ত্রিক, আর জ্ঞান হয়ে উঠছে পৃষ্ঠস্থ। যেমন Albert Einstein বলেছিলেন, “Education is not the learning of facts, but the training of the mind to think.” বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, বিজ্ঞান মানেই সূত্র মুখস্থ করা বা বইয়ের তথ্য আয়ত্ত করা। অথচ বিজ্ঞানমনস্কতা কোনো মুখস্থবিদ্যার ফল নয়; এটি গড়ে ওঠে প্রশ্ন করার সাহস, পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা থেকে। এ কারণেই আমরা প্রায়ই দেখি—উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের মধ্যেও কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাসের প্রভাব রয়ে গেছে।
প্রযুক্তিগত জ্ঞান একজন মানুষকে দক্ষ করে তুলতে পারে, কিন্তু যুক্তিবাদী করে তোলে না। যুক্তিবাদ আসে তখনই, যখন একজন ব্যক্তি নিজস্ব বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে শেখে, প্রমাণকে গুরুত্ব দেয় এবং অন্ধ অনুসরণের বদলে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাকে গ্রহণ করে। Carl Sagan যথার্থই বলেছিলেন, “Science is a way of thinking much more than it is a body of knowledge.” দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান কিংবা সাহিত্য এসব মানবিক বিদ্যার চর্চা এই চিন্তার জগৎকে আরও বিস্তৃত করে, মানুষকে করে তোলে উদার ও সহনশীল।
ইতিহাস সাক্ষী, মানবসভ্যতার অগ্রগতি এসেছে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই। ইউরোপের আলোকায়ন যুগ থেকে শুরু করে উপমহাদেশের মুক্তচিন্তার ধারায় যেখানেই যুক্তির আলো জ্বালানো হয়েছে, সেখানেই অন্ধকার পিছু হটেছে। বিপরীতে, যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ অগ্রগতির পথেই বাধা সৃষ্টি করে। Francis Bacon-এর ভাষায়, “Knowledge is power.”—তবে সেই জ্ঞানই শক্তি, যা মুক্তভাবে চিন্তা করতে শেখায়।
আজকের বিশ্বে কুসংস্কার, অপবিজ্ঞান ও ধর্মান্ধতার বিস্তার আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায় এবং সত্যকে গ্রহণ করার সাহস জোগায়।
অতএব, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পেশাজীবী তৈরি করা নয়; বরং এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা যুক্তিকে মূল্য দেয়, প্রমাণকে অনুসরণ করে এবং মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে পারে। কারণ, যে সমাজে প্রশ্ন বেঁচে থাকে, সেই সমাজই এগিয়ে যায়।
আপনার মতামত লিখুন :