অসহায় – শিরীণ আক্তার

স্বামী স্ত্রী বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। স্বামী নিজের হাতে নিয়ে খেতে চায়না। স্ত্রীর বেড়ে দেওয়া ডাইনিং টেবিলের বাটি থেকে চামচ দিয়ে নিজের পাতে নিয়ে খায়না কখনোই।তাকে স্ত্রী থাকলে স্ত্রী অথবা যে সামনে থাকে তাকেই তার প্লেটের মধ্যে ভাত তরকারি তুলে দিতে হবে। তারপর তিনি অতি ধীরে ধীরে খুঁটে খুঁটে খায়। তার আরেকটা অভ্যাস একা বসে খায়না, কেউ না কেউ তার সামনে বসে থেকে পরিবেশন করতে হবে। তবেই তিনি কথা বলতে বলতে বা কথা না বললেও পাশে কেউ বসে থাকতেই হবে, এটাই তার স্বভাব। তার ব্যতিক্রম হলে রাগ করে বকতে বকতে বাইরে গিয়ে খাবে। তবুও নিজের হাতে নিয়ে খাবে না। আজও একই নিয়মে দুজন খাচ্ছে। স্ত্রী বেলি স্বামীর প্লেটে ভাত ও ব্যাঞ্জন বেড়ে দিয়ে নিজের প্লেটে ও নিল। স্বামী নিত্য দিনের মতোই বললো, এই দেখেছো, আমার পাতে মরিচ আসবেই। মরিচ দিয়ে রেঁধেছো ওটা আমার পাতে পড়বেনা তা কী হয়? একবেলা ও মরিচ ছাড়া খেতে পারি না,আমার এমনই দুর্ভাগ্য! আসলে সে একটু বেশিই খুঁতখুঁতে স্বভাবের। সহজ ভাষায় যাকে বলে ছিদ্রান্বেষী। ওরা কাঁচা মরিচ দিয়ে সব্জি ভাজি ও তরকারি খেতে পছন্দ করে, তাই মরিচ তো পাতে যেতেই পারে। ওটা তুলে বোন প্লেটে রাখলেই চলে। কিন্তু তা না করে স্ত্রীকে একটা ভেংচি মারাই তার নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস। এটাও বেলির গা সওয়া হয়ে গেছে। তাই এখন আর কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না।তার আজ মনে অন্য চিন্তা কাজ করছে। ভাতের প্লেটে হাত দিয়ে ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছে সে।
আজ অনেক দিন ধরে মাঝে মধ্যে কাজ করে দিতো যে প্রতিবন্ধী সন্তানের মা, সে আসে না। বেলির ঘরদোরে বেশ আবর্জনা জমে গেছে। ওই মেয়েটির মায়াবী মুখটি বেলির চোখে ভেসে উঠলো। মেয়েটি অসম্ভব অসহায়। তিন তিনবার বিয়ে দিয়েছে ওর বাবা মা। তিন স্বামীর ঔরসেই তার বাচ্চা হয়েছে। অথচ তিনটা স্বামীই তাকে ছেড়ে অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে। বাচ্চাগুলোর খোঁজ খবর ও নেয়নি। ওর অপরাধ, মেয়েটি স্বাভাবিকের চেয়েও একটু বেশি কালো। একটু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বলেও মনে হয়। বেশি বেশি কথা বলে। কিন্তু ওর চাহনি, হাসি বা শরীরের গড়নে কোনো খুঁত নেই। ওর কাজকর্মের মধ্যেও ফাঁকি নেই। চুরির স্বভাব ও নেই। তবুও কেন যে সে স্বামীর সংসারে টিকে থাকতে পারলো না বেলির মনে বিস্ময়। শেষ স্বামীটা নাকি প্রতিবন্ধী সন্তানের কারণে পালিয়ে গেছে, তারই চাচাতো বোনকে নিয়ে।
সে যা-ই হোক, এই মেয়েটি ঘটনাচক্রে এসে পড়ে বেলির কাছে কাজের সন্ধানে ও একটু মাথা গোঁজার আশায়। বেলির ও দীর্ঘদিন ধরে কাজে সাহায্য করার কেউ নেই বলে ওকে সাময়িক আশ্রয় দেয়। তবে সে তো তার স্বামীর অনুমতি নিয়ে মেয়েটিকে থাকতে দেয়নি। এটাই হয়ে গেছে মস্ত অপরাধ। কারণ একটা আছে অবশ্য, যেটা বেলি জানতো না। মেয়েটি তার প্রতিবন্ধী বাচ্চা নিয়ে থাকবে, খাবে আর কাজ করবে বেলির সাথে এরকম কথা হয়েছে। কিন্তু দুদিন পরই মেয়েটি তার বাচ্চাকে প্রতিবন্ধী সেন্টারে থেরাপি দেবার কথা বলে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে রাত দশটার পরে। এতে বেলি বেশ চিন্তায় পড়ে। বলে —
তুই আমার কাছে না বলে বেশি রাত পর্যন্ত বাইরে থাকবি না।কত আপদবিপদ হতে পারে। তুই একটা জোওয়ান মেয়ে।
সে ও মাথা নেড়ে রাজি হয়, আর কখনও দেরি করে বাসায় আসবে না।
পরদিনই সে সকাল দশটার দিকে একটা জরুরি কাজের দোহাই দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এবার ফেরে সন্ধ্যার পর। তাতেও বেলি কিছু মনে করেনি।মেয়েটি হাসি মুখে বেলির প্রয়োজনীয় কাজ তো করে দেয়।
বিপত্তি ঘটে সপ্তাহ খানিক পরে। বেলির বাসায় কিছু গেস্ট আসে। এসে সুখীকে দেখে বলে — কীরে সুখী তুই এখানে? ওরা একটু বিস্মিত হয়। বেলি ওদের চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এখানে কিছু একটা আছে। তাই বেলি ওদের কাছে জানতে চায় ঘটনা কী? আর তখনই আসল রহস্য বেরিয়ে আসে। সুখী আসলে একটা পেশাদার ভিখারি। প্রতিবন্ধী বাচ্চা কোলে করে বাজারে বাজারে হেঁটে হেঁটে ভিক্ষা করতে ওকে শহরের অনেকেই দেখে। ঘরগেরস্থালীর কাজ তার গায়ে সয় না। এটা বেলির স্বামীর কানে যেতেই সে বলে এ মেয়েকে আমার বাড়িতে জায়গা দিও না। ওকে আজই আমার ঘর থেকে বের করে দাও। বেলি তো হতবাক। এরই মধ্যে মেয়েটির প্রতি বেলির বেশ তার মায়া বসে গেছে। (চলবে)
আপনার মতামত লিখুন :