
গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই সংঘাত শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দেওয়ার মুখে ফেলেছে। ইরানে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান সরকারের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। আর সেই ব্যর্থতার দায় চাপানো হচ্ছে একজনের ওপর—প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওপর। তাঁকে বলির পাঁঠা বানানোর এই প্রচেষ্টা কেবল জনঅসন্তোষ প্রশমনের কৌশল নয়; বরং শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আড়াল করারও একটি উপায়।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক দিন পর সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রথম প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, এই চুক্তি নিয়ে তাঁর ‘ভিন্নমত’ ছিল। তবে ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট দেশের ও ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’-এর স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ‘স্পষ্টভাবে দায় নিয়েছেন’—এই বিবেচনায় তিনি চুক্তির অনুমতি দেন।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিবৃতিতে মূল আলোচকের নামই উল্লেখ করা হয়নি। তিনি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘ব্যবস্থার (নেজাম) পক্ষ থেকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জনাব গালিবাফকে।’
এতে এমন একটি চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির দায় এমন একজনের কাঁধে চাপানো হচ্ছে, যিনি আলোচনার মূল দায়িত্বে ছিলেন না। গালিবাফের নাম বাদ দেওয়া নিছক ভুল নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। চুক্তি সফল হলে কৃতিত্ব গালিবাফের, আর ব্যর্থ হলে দায় পেজেশকিয়ানের—যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের ক্ষমতার সমীকরণ যেন এমনই।
এই সমঝোতা স্মারকের পেছনে ছিল ইরানের প্রকৃত ক্ষমতাকেন্দ্র—সামরিক ও বনিয়াদভিত্তিক যৌথ নেটওয়ার্ক। এতে রয়েছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) এবং মোস্তাজাফান ও সেতাদের মতো বৃহৎ ধর্মীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
গত দুই দশকে বেসরকারীকরণের নামে এই গোষ্ঠীগুলো দেশের অর্থনীতির বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার প্রত্যক্ষ সমর্থনের কারণে সাধারণ প্রশাসনের তাদের ওপর কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গার্ডিয়ান কাউন্সিলও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে তাদের প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখেছে।
তবে এই ক্ষমতাকাঠামোও এখন আর একতাবদ্ধ নয়। সমঝোতা স্মারকের পর অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে আছেন গালিবাফের মতো প্রযুক্তি ও অর্থনীতিমুখী নেতারা। আইআরজিসির নির্মাণ সংস্থার প্রধান, তেহরানের মেয়র এবং পার্লামেন্ট স্পিকার হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান এই গোষ্ঠীর প্রভাবের প্রতীক।
অন্যদিকে রয়েছে ‘পায়দারি ফ্রন্ট’-এর মতো কট্টরপন্থী গোষ্ঠী। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল এবং পশ্চিমা বিনিয়োগ ইরানের শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি।
এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু একটি প্রস্তাবিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল। গালিবাফপন্থীরা মনে করেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এটি অপরিহার্য। বিপরীতে কট্টরপন্থীদের দাবি, এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে।
অভ্যন্তরীণ বিতর্কে গালিবাফপন্থীরা এগিয়ে থাকলেও যুদ্ধবিরতি ও চুক্তি—দুটিই এখন ভেঙে পড়ার মুখে। কিন্তু এর দায় তাঁকে বহন করতে হচ্ছে না। কারণ, খামেনি ও আইআরজিসির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর—যে সুবিধা পেজেশকিয়ানের নেই।
পেজেশকিয়ানের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক নেই। বড় কোনো সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠীও তাঁর পাশে নেই। অথচ পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের প্রত্যেকেরই ছিল নিজস্ব ক্ষমতার ভিত্তি। আকবর হাশেমি রাফসানজানির ছিল শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক, মোহাম্মদ খাতামির ছিল সুসংগঠিত সামাজিক ভিত্তি, আর হাসান রুহানির ছিল দলীয় প্রভাব ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। পেজেশকিয়ানের এই তিনটির কোনোটিই নেই। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সীমাবদ্ধতাই তাঁকে শাসকগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
আপাতত আইআরজিসি ও গালিবাফঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো পেজেশকিয়ানকে কট্টরপন্থীদের আক্রমণ থেকে কিছুটা রক্ষা করছে। তবে এটি সহানুভূতি নয়; বরং রাজনৈতিক কৌশল। চুক্তি যতদিন টিকে থাকবে, ততদিনই এই সুরক্ষা থাকবে। চুক্তি ভেঙে পড়লে সেই সুরক্ষাও শেষ হয়ে যাবে।
এই কৌশল নতুন নয়। আলী খামেনিও একদিকে পরমাণু আলোচনা অনুমোদন দিতেন, অন্যদিকে প্রকাশ্যে বলতেন—যুক্তরাষ্ট্রকে কখনোই বিশ্বাস করা যায় না। ফলে চুক্তি সফল হোক বা ব্যর্থ, কট্টর সমর্থকদের কাছে তাঁর অবস্থান অটুট থাকত। বর্তমান নেতৃত্বও যেন একই রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে।
এ মুহূর্তে পেজেশকিয়ানকে বলির পাঁঠা বানানোর কৌশল হয়তো সাময়িকভাবে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আড়াল করছে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারপন্থী এবং স্থায়ী সংঘাতকেন্দ্রিক দুই শক্তির মধ্যে বিভাজন এতটাই গভীর যে, কোনো একজন ব্যক্তির ওপর দায় চাপিয়ে তা দীর্ঘদিন চাপা রাখা সম্ভব হবে না। বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ভূমিকা শেষ হয়ে গেলে, প্রকৃত ক্ষমতার লড়াই শুরু হবে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরেই।
আপনার মতামত লিখুন :