
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : ঘণ্টা পড়েছে। শিক্ষার্থীরা ঢুকেছে শ্রেণিকক্ষে। বই-খাতা খুলে অপেক্ষা করছে শিক্ষকের জন্য। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কোনো কক্ষে আসছেন না শিক্ষক। কোথাও একজন শিক্ষককে সামলাতে হচ্ছে একাধিক শ্রেণি, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস নিয়মিত হচ্ছে না। ফলে শ্রেণিকক্ষে বসেই সময় কাটছে অনেক শিক্ষার্থীর।
দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের এমন চিত্র দীর্ঘদিনের। প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক সংকট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজ, হাতিয়া শহর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ওছখালী খান সাহেব ছৈয়দিয়া (কেএসএইচ) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে সংকটের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদই শূন্য। শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে বড় ঘাটতি।
কলেজের তথ্য অনুযায়ী, ৮টি সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। ১৫টি সহকারী অধ্যাপক পদের মধ্যে ১৩টিই শূন্য। ২৪টি প্রভাষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ জন। সব মিলিয়ে এসব তিন স্তরে ৪৭টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। শূন্য ৩২টি পদ।
ফলে একদিকে যেমন শিক্ষকরা অতিরিক্ত ক্লাস ও দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত পাঠদানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ইংরেজি, ইসলামের ইতিহাস ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে শিক্ষক সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগেও গণমাধ্যমে এ সংকটের কথা উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে কলেজটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও শিক্ষক ও শূন্য পদের তথ্য আলাদাভাবে রাখার বিষয়টি দেখা যায়।
কলেজের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা দ্বীপের সন্তান। এখান থেকেই ভালো ফল করে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাই। কিন্তু নিয়মিত ক্লাস না হলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষককে যখন একাধিক শ্রেণি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হয়, তখন আমরাও কাঙ্ক্ষিত পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হই।
মাধ্যমিক পর্যায়ে সংকট আরও প্রকট হাতিয়া শহর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিতে ২৭টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন।এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদান, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, প্রশাসনিক কাজসহ বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়েও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বলেন, “আমাদের অনেকের পরিবারের পক্ষে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। তাই এই বিদ্যালয়ের ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। আমরা চাই, প্রতিটি বিষয়ে দ্রুত শিক্ষক দেওয়া হোক।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সোহেল উদ্দিন বলেন, “২৭ জনের কাজ তিনজন দিয়ে চালানো অসম্ভব এক বাস্তব চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।এর আগে হাতিয়া শহর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও ওছখালী কেএসএস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কথা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল।
একই চিত্র ওছখালী খান সাহেব ছৈয়দিয়া (কেএসএইচ) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়।বিদ্যালয়টিতে ২৭টি মঞ্জুরিকৃত শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন আটজন। শূন্য রয়েছে ১৯টি পদ।বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “স্কুলে এসে শিক্ষক না পেলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। পরীক্ষার আগে শিক্ষকরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। কিন্তু সারা বছর নিয়মিত ক্লাস না হলে শেষ সময়ে এসে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফুল মাওলা বলেন, “সীমিত জনবল দিয়ে সব বিষয় কাভার করা যাচ্ছে না। দ্বীপের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা দরকার।”
বাড়ছে কর্মরত শিক্ষকদের চাপ।শিক্ষক সংকটের প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়ছে না, চাপ বাড়ছে কর্মরত শিক্ষকদের ওপরও।একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান, অতিরিক্ত বিষয়ের ক্লাস এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে।
হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের এক অধ্যাপক বলেন, “দুর্গম দ্বীপাঞ্চলে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে শিক্ষার মান ধরে রাখতে হলে দ্রুত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন জরুরি। দ্বীপাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থায় শিক্ষক পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মূল ভূখণ্ডের তুলনায় হাতিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগও সীমিত। কোনো বিষয়ে শিক্ষক না থাকলে বা নিয়মিত ক্লাস না হলে সেই ঘাটতি পূরণের সুযোগ অনেকেরই থাকে না।
এক শিক্ষার্থী বলেন, “মূল ভূখণ্ডের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি কোচিং, প্রাইভেট ও অনলাইন শিক্ষার সুযোগ পায়। আমাদের অনেকের সেই সুযোগ নেই। একটি বিষয়ের শিক্ষক না থাকলে সেই ঘাটতি পূরণ করাও কঠিন।
হাতিয়া কলেজ ও প্রকৌশলী ফজলুল আজিম মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. এনামুল হক বলেন, “শিক্ষক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। মূল ভূখণ্ডের তুলনায় দ্বীপাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগও কম। ফলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসেও জনবল সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনেও জনবল ঘাটতির প্রভাব পড়ছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ভবন, আসবাব বা প্রযুক্তি থাকলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকি।দুর্গম ও উপকূলীয় অঞ্চলে শিক্ষক পদায়ন ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা থাকলেও তার প্রভাব যেন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর না পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি তাঁদের।
হাতিয়ার মতো দ্বীপাঞ্চলে শিক্ষক সংকটের পেছনে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মস্থলে আবাসন সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষক পদায়নের নানা বাস্তব সমস্যা রয়েছে। অতীতের একটি প্রতিবেদনে হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের শিক্ষক সংকটের ক্ষেত্রে আবাসন সমস্যার কথাও উঠে এসেছিল।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই হবে না; শিক্ষকরা যাতে কর্মস্থলে থাকেন এবং দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজনে দুর্গম ও উপকূলীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ পদায়ন নীতি, আবাসন সুবিধা, নিয়মিত একাডেমিক তদারকি এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।হাতিয়ার শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাও খুব বেশি নয়। তারা চায়, ঘণ্টা বাজার পর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আসবেন, প্রতিটি বিষয়ের নিয়মিত ক্লাস হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ থাকবে।
দ্বীপের শিক্ষার্থীদের ভাষায়, শিক্ষা তাদের কাছে কোনো অনুদান নয়; এটি তাদের অধিকার।এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এখন প্রয়োজন শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি হাতিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকটের স্থায়ী সমাধান।
আপনার মতামত লিখুন :