
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সংবাদদাতা : দিন হোক কিংবা রাত—কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটে যমদূতের মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাটি-বালুবাহী ড্রাম ট্রাক। স্থানীয় প্রশাসন ও সংসদ সদস্যের (এমপি) নিষেধাজ্ঞা ও কড়া হুঁশিয়ারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২৪ ঘণ্টাই চলছে এই অবৈধ বালু-মাটি বাণিজ্যের মহোৎসব। তবে দিন ও রাতে এই সিন্ডিকেটের তাণ্ডবের রূপ কিছুটা ভিন্ন। দিনে চলে আইনকে ফাঁকি দেওয়ার ‘কৌশলী খেলা’ আর রাত নামলেই শুরু হয় বেপরোয়া গতির ‘মৃত্যু উৎসব’।
প্রশ্ন উঠেছে, খোদ এমপি ও প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে দিন-রাত সমানতালে পরিবেশ দূষণ ও জনপদ ধ্বংস করার এই সীমাহীন দুঃসাহস এই বালু সিন্ডিকেট কোথায় পাচ্ছে? কার ইশারায় জিম্মি হয়ে পড়েছে গোটা কোম্পানীগঞ্জ?
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, বসুরহাট ও এর আশপাশের সড়কগুলোতে বালু -মাটি সিন্ডিকেটের তাণ্ডব এখন চব্বিশ ঘণ্টার রুটিন। দিনের বেলা প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে এরা কিছুটা কৌশলী ভূমিকা নেয়। তবে গতি ও নিয়মের কোনো বালাই থাকে না। ব্যস্ততম সময়ে, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের তোয়াক্কা না করে তীব্র গতিতে ছুটে চলে এই ড্রাম ট্রাকগুলো। ট্রাকে কোনো ত্রিপল বা ছাউনি না থাকায় বাতাসে উড়তে থাকা বালুর কারণে পুরো বসুরহাট বাজার ও আশেপাশের সড়কগুলো ধুলোর মরুভূমিতে পরিণত হয়। এতে শিক্ষার্থী, পথচারী ও ব্যবসায়ীদের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
রাতের চিত্র রীতিমতো বিভীষিকাময়,ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা নামার পরপরই সিন্ডিকেটের রূপ পুরোপুরি বদলে যায়। রাস্তাঘাট কিছুটা ফাঁকা পেয়ে ড্রাম ট্রাকগুলো যেন ‘রোড মনস্টার’ বা খুনি দানবে রূপ নেয়। অতিরিক্ত বোঝাই (ওভারলোড) করে একেকটি ট্রাক প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। বিকট শব্দ আর নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্নের তাণ্ডবে সড়ক ঘেঁষা বাড়িগুলোর মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে এই বেপরোয়া গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, ঝরছে তাজা প্রাণ।
সিন্ডিকেটের এই দিন-রাতের ওভারলোডেড ট্রাক চলাচলের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উপজেলার, বসুরহাট পৌরসভা ও আশেপাশের প্রধান প্রধান সড়কগুলো ধসে যাচ্ছে,চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সড়কগুলো। এলজিইডি ও সড়ক বিভাগের পিচ ঢালাই রাস্তাগুলো ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ট্যাক্সের টাকা দিয়ে যে রাস্তা পায়, তা এই মুষ্টিমেয় বালু-মাটি খেকোদের পকেটের স্বার্থে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছালে গত উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবং স্থানীয় এমপির নির্দেশে বালুবাহী ভারী যানবাহন চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নিষেধাজ্ঞা জারির পর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমার বদলে উল্টো বেড়েছে।
বেসরকারী হাসপাতাল মালিক সমিতির নেতা হাজী আবদুল কুদ্দুছ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: ”দিনের বেলা এরা একটু লুকিয়ে-চুরিয়ে চললেও রাত হলেই এদের আসল রূপ বের হয়। এদের রাতের দৌরাত্ম্যে সড়কের সাথে ভবনগুলোও কেঁপে ওঠে। প্রধান সড়কের দু’পাশের হাসপাতালের রোগীরা আতংকে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
গত উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,গণমাধ্যম কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে মিটিংএ স্থানীয় এমপি মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম অবৈধ মাটি বা বালুবাহী ড্রাম ট্রাকগুলো না চালানোর জন্য কঠোর নিষেধজ্ঞা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সিন্ডিকেটের পকেটে টাকা থাকলে নাকি আইনও অন্ধ হয়ে যায়—কোম্পানীগঞ্জের চিত্র দেখলে সেটাই বিশ্বাস করতে হয়।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক লেবাসধারী কিছু অসাধু নেতা ও প্রশাসনের নীচের স্তরের কিছু অর্থলোভী কর্মচারীর অলিখিত সমঝোতাতেই দিন-রাত এই অবৈধ বালু-কৃষিজমির টপসয়েল লুটের কারবার সচল রাখা হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টার এই বাণিজ্য থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অবৈধ চাঁদা পকেটে ভরছে এই সিন্ডিকেট। আর এর মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ নিজের জীবন ও নিরাপত্তা দিয়ে।
কোম্পানীগঞ্জের সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের দাবি—লোক দেখানো দু-একটি জরিমানা বা কাগুজে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে দমানো যাবে না। যদি প্রশাসন সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে দিন এবং রাত—উভয় সময়েই আকস্মিক চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। ট্রাকগুলো জব্দ করে এবং এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করলেই কেবল কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও বসুরহাট পৌরসভার মানুষ দিন ও রাতে শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।
সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামকে এই ড্রাম ট্রাক ও অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, জনদুর্ভোগ তৈরি করে এই অবৈধ ব্যবসা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশ এবং এমপির হুঁশিয়ারি যেন কেবলই হুঁশিয়ারিতে সীমাবদ্ধ।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ মাসুদুর রহমান বলেন—”অবৈধ বালু পরিবহন এবং বেপরোয়া ড্রাম ট্রাকের বিরুদ্ধে আমাদের একাধিক মোবাইল কোর্ট ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা অনেককে জরিমানাও করেছি। জনস্বার্থে এবং সড়ক রক্ষার্থে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
প্রশাসন কি পারবে এই চব্বিশ ঘণ্টার ‘ডেথ ট্র্যাপ’ থেকে এজনপদের মানুষকে মুক্ত করতে? নাকি অবৈধ সিন্ডিকেটের প্রভাব আর টাকার জোরেই চাপা পড়ে থাকবে আইন—এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আপনার মতামত লিখুন :