
একটানা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক গুমোট ভাব ও নজিরবিহীন ওলটপালটের পর দেশের দায়ভার এককভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর বিগত ১০০ দিনে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন খাতে একগুচ্ছ ইতিবাচক, যুগোপযোগী ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপের খতিয়ান তুলে ধরেছেন। তবে এই শাসনতান্ত্রিক জৌলুস ও রাজনৈতিক সুবাতাসের সমান্তরালেই দেশের অভ্যন্তরে তীব্র ডালপালা মেলতে শুরু করেছে এক অদৃশ্য, রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সংকট—যার নাম সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম বিপর্যয়। দিন যত গড়াচ্ছে, দেশের জননিরাপত্তার সূচকগুলো ততই দ্রুততার সাথে নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের প্রাতেহিক যাপনে এখন জেঁকে বসেছে এক গভীর শঙ্কা, ভয় এবং তীব্র মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রাজধানী ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত অপরাধের মানচিত্রটি বর্তমানে এমন এক বিপজ্জনক অবয়ব ধারণ করেছে, যা খোদ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেই বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিদিন প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া, সুপরিকল্পিত টার্গেট কিলিং, শিশু ও নারী নির্যাতন এবং নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা নিয়মিত স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না, অথচ আজ বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকের কপালে এটিই যেন অলিখিত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি দেশের একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশেষ অপরাধ অনুসন্ধান এবং অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেশের এই কঙ্কালসার অপরাধচিত্রটি জনসমক্ষে আনা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণধর্মী উপাত্ত ঘেঁটে দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল, মাঠপর্যায়ে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি, সুপরিকল্পিত টার্গেট কিলিং এবং সশস্ত্র হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত ও নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত গোপন এবং সাম্প্রতিক অপরাধ পরিসংখ্যানের গ্রাফ ঘেঁটে গণমাধ্যমগুলো দেখাচ্ছে যে, বিগত মাত্র তিন মাসে দেশব্যাপী অন্তত ৯১৫টি সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। এই বিপুল পরিসংখ্যানকে যদি আমরা দৈনিক সাধারণ হিসাবে রূপান্তর করি, তবে দেখা যায় যে দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন গড়ে ১০ জনেরও বেশি নিরীহ মানুষ নৃশংসভাবে খুনের শিকার হচ্ছেন। কোনো দুর্ঘটনা বা স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা এখানে বলা হচ্ছে না, এটি নিখাদ ও ঠান্ডা মাথার অপরাধমূলক নরহত্যা। অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অপরাধীদের মধ্যে যেখানে আইনের প্রতি এক ধরনের ভয় কাজ করার কথা ছিল, সেখানে পরিসংখ্যানের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ প্রমাণ করে যে অপরাধী চক্র বর্তমানে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না। এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটার পেছনে আমাদের শাসন ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাজ করতে না পারার চরম ব্যর্থতাই প্রকাশ পায়।
অপরাধ জগতের এই হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনের মনস্তত্ত্ব ও কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা প্রধানত তিনটি মূল কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করছেন। প্রথমত, মাঠপর্যায়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপক ও অবাধ অনুপ্রবেশ এবং এর যথেচ্ছ ব্যবহার এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের বড় ধরনের গণ-আন্দোলন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি এবং সরকারি অস্ত্রাগার থেকে যে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গুলি লুট হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল, তার একটি বড় অংশই আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই লুণ্ঠিত ও বেআইনি অস্ত্রগুলো এখন দেশের ছোট-বড় আন্ডারওয়ার্ল্ড চক্র, শহরের কিশোর গ্যাং এবং এলাকাভিত্তিক অপরাধীদের হাতে হাতে ঘুরছে। দ্বিতীয় বড় কারণটি হলো, দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসানের পর দেশের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিশেষ করে পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের চরম স্থবিরতা, চেইন অব কমান্ডের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা ভর করেছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা এখনো এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা ও বদলিজনিত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার ফলে অপরাধ দমনে তাঁদের যে দৃশ্যমান ও মারমুখী তৎপরতা থাকার প্রয়োজন ছিল, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে সবচেয়ে বিপজ্জনক তৃতীয় কারণটি—২০২৪ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে থাকা কিংবা দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়া তালিকাভুক্ত ও দাগি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হঠাৎ করে পুনরায় প্রকাশ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিরে আসা। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতা বদলের সুযোগ নিয়ে জামিনে মুক্ত হয়ে কিংবা চোরাই পথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখন আবারও পুরোনো অপরাধ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বর্তমান ক্ষমতা বলয়ের ভেতরের একাংশের সাথে আঁতাত করে তারা মতিঝিল, রামপুরা, মিরপুর বা চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকাগুলোতে ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট নতুন করে সাজাচ্ছে। জিসান আহমেদ, কাইল্যা পলাশ বা নাঈম ইসলাম টিটনের মতো কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুশীলবরা দেশ ও দেশের বাইরে বসে কলকাঠি নাড়ছে, যার ফলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য রাস্তায় অস্ত্রের মহড়া ও নৃশংস খুনের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গত কয়েক দিনে মগবাজার, নিউমার্কেট এবং মৌচাক এলাকায় যেভাবে দিনের আলোয় প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী ও প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
যদি আমরা পুলিশ সদর দপ্তরের সরবরাহ করা এবং গণমাধ্যমে উঠে আসা মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তবে দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে অপরাধের যে এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সংযোগ রয়েছে, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তিন মাসের ৯১৫টি খুনের মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৩১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই ঘটেছে গত মার্চ মাসে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মার্চ মাসটি ছিল মূলত দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভেঙে বিএনপির এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার ঠিক পরবর্তী প্রথম মাস। ক্ষমতা বদলের এই প্রাথমিক ক্ষণেই দেশজুড়ে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কোন্দল, ইউনিয়ন বা উপজেলাভিত্তিক আধিপত্যের রদবদল এবং পুরোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেটানোর এক মারাত্মক সহিংস রূপ দেখা গিয়েছিল, যা এই ৩১৭টি মার্ডার কেসের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। মার্চের এই প্রাথমিক রক্তক্ষয়ী ধাক্কার পর পরবর্তী মাসগুলোতেও অপরাধের এই লাগামহীন গ্রাফ খুব একটা নিচে নামেনি; এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসের মাত্র ২৭ দিনেই ৯৮টি সহ মোট ৩১০টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসেই গড়ে প্রায় ৩০০ জনের কাছাকাছি মানুষ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা জনসমক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে নিয়মিত দাবি করলেও, খোদ পুলিশের নিজস্ব এই পরিসংখ্যানই সরকারের সেই আশ্বস্ত বাণীকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের এই পরিসংখ্যানের সাথে যদি আমরা বিগত বছরগুলোর তুলনামূলক চিত্র মেলাই, তবে জননিরাপত্তার এই ধস আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় যে, বিগত ২০২৫ সালের একই সময়ে (মার্চ-মে) দেশে ৯৯৩টি হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা চলতি বছরের চেয়ে কিছুটা বেশি। কিন্তু এর ভেতরে এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে যা সাধারণ মানুষের নজর এড়িয়ে যায়। পুলিশের নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ২০২৫ সালের ওই ৯৯৩টি মামলার মধ্যে ২২৬টি ব্যবস্থাপনামূলক মামলাই ছিল মূলত পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী শাসনের সময় ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক সংঘাত ও গুমের ঘটনা থেকে বিলম্বিত হয়ে আসা মামলা। অর্থাৎ গত বছর তাৎক্ষণিক বা চলতি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সংখ্যা ছিল বর্তমান বছরের চেয়ে অনেক কম।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মূল বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের একই তিন মাসে দেশব্যাপী দায়ের হওয়া খুনের মামলার মোট সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৯৪টি। ফলে বিগত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অধীনে এসে দেশে তাৎক্ষণিক, নতুন ও আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যে আশঙ্কাজনকভাবে এবং জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা এই তুলনামূলক পরিসংখ্যান থেকেই সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়।
গণমাধ্যমের আঞ্চলিক অপরাধ মানচিত্রটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের আটটি বিভাগ বা রেঞ্জের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও বিপজ্জনক অঞ্চল হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা রেঞ্জ। ভৌগোলিক বিস্তৃতি, সুউচ্চ জনঘনত্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কারণে চলতি বছরের এই নির্দিষ্ট তিন মাসে সর্বাধিক ২০৭টি হত্যাকাণ্ডের মামলা রেকর্ড হয়েছে শুধু ঢাকা রেঞ্জেই। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও গাজীপুরের কাপাসিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও মানিকগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে অপরাধীদের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। ঢাকার এই শীর্ষ অবস্থানের ঠিক পরেই অপরাধের মানচিত্রে দ্বিতীয় বিপজ্জনক অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে বাণিজ্যিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম রেঞ্জ। এই তিন মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জে মোট ১৮৬টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। আঞ্চলিক আধিপত্য, পাহাড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এই অঞ্চলে খুনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রাউজানের মতো ব্যস্ত বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করা এবং আতঙ্কে দীর্ঘ সময় তাঁর লাশ বাজারে পড়ে থাকার ঘটনা প্রমাণ করে যে সমাজ থেকে মানবিক মূল্যবোধ ও আইনি শাসন কতটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া দেশের পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়; রাজশাহী রেঞ্জে ১০৬টি এবং শিল্প ও সীমান্তবর্তী খুলনা রেঞ্জে ৮৪টি হত্যাকাণ্ডের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে খুলনা মহানগরে বিশেষ যৌথ অভিযান চলাকালীনই প্রকাশ্য রাস্তায় মোটরবাইকে এসে বিএনপি নেতাকে গুলি করে মেতে ওঠা হয়েছে নতুন খুনের উৎসবে।
আইনশৃঙ্খলার এই চরম অবনতিশীল পরিস্থিতির সমান্তরালেই দেশের বর্তমান সরকারের ওপর ভর করেছে একটার পর একটা পাহাড়সম সংকটের বোঝা। বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কিছু অভ্যন্তরীণ ভুল নীতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১১ দিনের মাথায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হওয়া আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের সরাসরি ধাক্কা এসে পড়েছে বাংলাদেশের ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার অজহাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম এক লাফে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাবে পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হয়ে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ের এই জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য মেলাতে না পেরে হিমশিম খাচ্ছে কোটি পরিবার। এই অর্থনৈতিক সংকটের ওপরে আবার যুক্ত হয়েছে দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের চরম অভাব ও রেকর্ড খেলাপি ঋণ, যা বর্তমানে মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে বা ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। আইএমএফ ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে নতুন কোনো বাজেট সহায়তার ইতিবাচক সাড়া না মেলায় দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর। ডলার সংকট, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের হারের কারণে নতুন বিনিয়োগ সম্পূর্ণ থমকে গেছে, যা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য এক বড় ধরনের অশনিসংকেত।
অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার এই জোড়া সংকটের মাঝেই দেশের ওপর এসেছে এক প্রলয়ঙ্কারী স্বাস্থ্য বিপর্যয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ইতিমধ্যে ৬১৩ জন অবুজ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে, যার পেছনে মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা ক্রয়ে উদাসীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাগ্রহকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। হামের এই ভয়াবহতার মধ্যেই আবার নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে ডেঙ্গু, যা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙার চোখ রাঙানি দিচ্ছে। এই অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সংকটের অন্ধকার মেঘ যখন চারপাশকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, ঠিক তখনই দেশের সীমান্ত এলাকায় দেখা দিয়েছে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের সংকট। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানকার বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ও কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) অপচেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে নারী ও গর্ভবতী মা ও শিশুসহ শত শত মানুষকে জিরো লাইনে খোলা আকাশের নিচে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আটকে রেখে এক যুদ্ধকালীন ও চরম অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অত্যন্ত শক্ত হাতে প্রতিহত করছে।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও চুরির মতো গুরুতর অপরাধের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের সামাজিক সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ তচ্ছন্ন করে দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সামাজিক অবক্ষয় ও পরকীয়া-মাদকজনিত পারিবারিক সহিংসতা, যেখানে আপনজনের হাতেই খুন হচ্ছেন স্বজন, কিংবা তিন বছরের নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও মানবাধিকার কর্মীরা স্পষ্ট করে বলছেন, এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে আর বিন্দুমাত্র সময়ক্ষেপণ করা সাজে না। অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে পুলিশ প্রশাসনকে পেশাদারিত্বের সাথে পুনর্গঠন করতে হবে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় লুট হওয়া সমস্ত অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে দেশজুড়ে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে এক বিশেষ ও চিরুনি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশে ফিরে নতুন করে অপরাধের রাজত্ব কায়েম করছে, তাদের অবিলম্বে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে, জনমনে জমে থাকা এই তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অচিরেই দেশের সামাজিক সংহতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণআকাঙ্ক্ষার নির্বাচিত সরকারের ভিত্তিকেই সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com
আপনার মতামত লিখুন :