
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে মানবসভ্যতার অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমাগত বাড়ছে। গ্রিনহাউজ গ্যাসের অতিরিক্ত নির্গমনের কারণে ভেক্টরবাহিত রোগের বিস্তার, বাষ্পীভবন ও তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি, তাপমাত্রাজনিত চাপ, বায়ুদূষণ এবং খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যাও তীব্রতর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের মৌলিক চাহিদা বিশুদ্ধ বায়ু, নিরাপদ ও স্বচ্ছ পানীয় জল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং নিরাপদ বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য আজ এক নতুন সংকটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে শুধুমাত্র বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে বলে জানা গেছে।
জলবায়ু সংবেদনশীল স্বাস্থ্যসমস্যা যেমন অপুষ্টি, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। আগে যেসব অঞ্চলে ভৌগোলিক কারণে এসব রোগের প্রকোপ ছিল না বা তুলনামূলক কম ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই ভৌগোলিক সীমারেখা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে এবং নতুন নতুন এলাকায় এসব রোগের বিস্তার ঘটছে। ফলে নতুন স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগে যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও অন্যান্য জলবায়ু সংবেদনশীল রোগের প্রকোপ কম ছিল, সেসব এলাকাতেও নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষম নয়। তাই রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমানো, টেকসই জ্বালানি ব্যবহার, নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব স্বাস্থ্য সমস্যার প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড়ো হুমকি হয়ে উঠেছে। ১৯৮০ সালের পর থেকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং অনুভূত তাপমাত্রা প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দ্রুত নগরায়ণ ও বনভূমি হ্রাসের কারণে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, পানিশূন্যতা, হৃদরোগ, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি তাপজনিত অসুস্থতা দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালে তাপজনিত অসুস্থতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও অতিবৃষ্টি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৪ সালের বন্যায় কয়েক মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং বহু প্রাণহানি ঘটে। বন্যার পর ডায়রিয়া, ত্বকের রোগ ও পানিবাহিত সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দুর্যোগের পরবর্তী সময়েও মারাত্মক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা পানীয় জল ও কৃষি উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারের পরিবেশগত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাগরের উচ্চতা বছরে গড়ে ৩.৬ থেকে ৪.৫ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও ত্বকজনিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে আশ্রয়হীনতা, জীবিকা হারানো এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, ট্রমা ও বিষণ্নতা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের প্রকৃতি ক্রমাগত বদলে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে। অোমাদের দেশে পুকুর, খাল-বিল, নদী-নালার পানির অন্যতম উৎস বৃষ্টি। এই পানি আমরা পান করি এবং কৃষিক্ষেত্রে সেচের কাজে ব্যবহার করি। সুতরাং বিশুদ্ধ পানির অভাব বা সমস্যা হলে মানুষ পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে আপোস করতে বাধ্য হবেন। এর ফলে পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত হয়ে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়বে। অন্যদিকে, খরা ও বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় পানি দূষণ, মশাবাহিত রোগের বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত খাদ্যশস্য উৎপাদন কমিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাবে শামুক, মশা এবং অন্যান্য শীতল-রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর বিস্তার ও বংশবৃদ্ধির পরিবেশ আরও অনুকূল হয়ে উঠছে। ফলে পরিবর্তিত জলবায়ু, সংক্রমণের আদর্শ সময়কালকে দীর্ঘায়িত করছে, বাড়ছে রোগাক্রমণের ভৌগোলিক সীমানা। চীনে শামুকজাতীয় প্রাণীবাহিত সিস্টোসোমিয়াসিস রোগ অনেকটা অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একইভাবে, অ্যানোফিলিস মশাবাহিত ম্যালেরিয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুও দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের অনেক নারীকে নিরাপদ পানীয় জল সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন ২ থেকে ৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দিনে দুই থেকে তিনবার পানি আনতে গিয়ে তাদের প্রায় ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হয়। এই দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথচলা নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। ঋতুস্রাবের সময় অধিকাংশ নারী ছেঁড়া কাপড় ব্যবহার করেন, যা দীর্ঘ পথ চলার কারণে অতিরিক্ত অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতি এড়াতে কেউ কেউ ঋতুস্রাব বিলম্বিত করার জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করেন। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের ওষুধের ব্যবহার প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত ভারী পানির কলসি বহনের কারণে জরায়ুর স্থানচ্যুতি (প্রোল্যাপস) উপকূলীয় নারীদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, ঋতুস্রাবের সময় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার ফলে সংক্রমণ, প্রজননতন্ত্রের নানা জটিলতা, ঋতুচক্রের সমস্যা, অকাল গর্ভপাত এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপকূলীয় নারীদের শারীরিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে বহুমাত্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন রোগের বিস্তারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও উষ্ণ আবহাওয়ায় কলেরার মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ মহামারির রূপ নিতে পারে, পাশাপাশি ম্যালেরিয়া ও জাপানি এনসেফেলাইটিসের মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ, ইটভাটা স্থাপন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল আজ হুমকির মুখে। ফলে গ্রিনহাউজ প্রভাব ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমির সংকট ও নদীভাঙনের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ উভয়ই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ছে।
এসব ভূমিহীন, বেকার সর্বহারা মানুষ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে বস্তিতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। কোন রকমে একটা কাজ জুটিয়ে বস্তির অপরিসর নোংরা ঘিনঘিনে পরিবেশে ঠাঁই নিচ্ছে। এর ফলে একদিকে শহরের পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে বস্তিবাসীরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন ও নীতি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালের বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান, জাতীয় পরিবেশনীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, পানি নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন এবং ২০২২ সালের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা। এগুলো স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। পাশাপাশি প্যারিস চুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকারও উল্লেখযোগ্য।
জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক মানবজীবনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের বিস্তার, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অপুষ্টির মতো সমস্যাগুলো বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে ক্রমেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনভূমি রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, টেকসই উন্নয়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এর বিরূপ প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ
আপনার মতামত লিখুন :