• ঢাকা
  • রবিবার, ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১৩ জুন, ২০২৬

নুরজাহান বেগমের ট্রাজেডি: কাঠগড়ায় আমাদের আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা – মো. আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু

প্রতিদিনের মতো পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে বের হলাম বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজার করার উদ্দেশ্যে। রাস্তার মোড়ের দোকানটা থেকে ভেসে আসছিল গানের সুর– “মা যে শুধু মা নয় রে জান্নাতেরই চাবি/সেই মায়েরে দুঃখ দিলে জান্নাত কি তুই পাবি?” সত্যিই তো তাই, একজন মা তার সন্তানের জন্য কী না করেন? হাসিমুখে বিসর্জন দেন নিজের স্বপ্ন-সুখ-আহলাদ, জীবন-যৌবন সব। সে মা যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিঃসঙ্গতায় ধুঁকে ধুঁকে অবহেলায় করুণ মৃত্যুর শিকার হন, তখন তার এ ট্রাজিক মৃত্যুর পরিণতি সহ্য করার মতো নয়।

মিরপুরের হতভাগিনী মা নুরজাহানের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সমাজ ও সভ্যতাকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। চিন্তা জগতে ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন! বিবর্তনশীল পৃথিবীতে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়–হবে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে মানুষ হারাবে তার জন্ম শেকড় তা কাম্য নয়।

মাটির মায়াবী ঘ্রাণ চাপা দেওয়া ইট-পাথরের ব্যস্ত জনপদে আমাদের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো আকাশ ছোঁয়ার জন্য যতই উপরে উঠছে আমাদের ভেতরের মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন তথা মানবিকতা বোধ মনে হয় ততই নিচে নেমে যাচ্ছে। আমরা দিনের পর দিন যন্ত্রের মতো ছুটি সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত আর মেধাবী বানাতে। ভালো রেজাল্ট করানোর প্রতিযোগিতায় নামি। নামিদামি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় লাখ লাখ টাকা খরচ করি। অবশেষে সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক অথবা রাষ্ট্রের বড় কর্মকর্তা হিসেবে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। উচ্চ শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সফলতার গাদা গাদা ডিগ্রীর সার্টিফিকেটের স্তূপে অথবা কর্পোরেট সফলতার চাকচিক্যের আড়ালে আমরা কি ঢাকতে পেরেছি আমাদের ভেতরের দেউলিয়াত্ব আর নৈতিক পঙ্গুত্বের জীর্ণতার ছবি?

যাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখেছি, চলতে শিখেছি, কথা বলতে শিখেছি নিজের ক্যারিয়ারের আকাশ ছুঁতে গিয়ে উপরে তাকাতে তাকাতে আমরা এতটাই উন্মত্ত-অন্ধ হয়েছি যে, শেকড়ের দিকে নজর দিতেও ভুলে গেছি।

মাতা নুরজাহানের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই। এটি এখন আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া ট্রাজেডির জীবন্ত ক্যানভাস। অধিকাংশ পরিবার গুলোতে আজ এই অশুভ ঝোঁক (Trend) পরিলক্ষিত হচ্ছে যা খুব আশঙ্কার বিষয় এবং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের লাল সংকেত।

নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ে সবাই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। এক ছেলে বর্তমান সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, অন্য ছেলে কানাডিয়ান প্রবাসী, একমাত্র মেয়ে স্কুল শিক্ষক এবং মেয়ের জামাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক ছিলেন। সন্তানদের বড় করে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এই মা ও বাবা। একবারও কি ভাবা যায়, বিন্দু বিন্দু ঘামের রোজগারে খেয়ে না খেয়ে যে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করে বাবা-মা, তাদের বয়সকালে যখন সেই সন্তানদের ঘরে যত্নে-আদরে, শ্রদ্ধায় থাকার কথা তার বদলে জোটে তাদের নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব আর অবহেলা। এসি রুমে বসে সন্তানরা যখন আগামীর স্বপ্ন রচনা করেন তখন তার বাবা-মার ভাসে চোখের জলে। বাস করে ময়লা ধুলোবালির মাঝে। নচিকেতার সেই গানের মতো, “ছেলে আমার মস্ত বড় মস্ত অফিসার……
ছেলে মেয়েদের অট্টালিকায় তাদের পোষা কুকুর অ্যালসেশিয়ানের জায়গা হলেও ঠাঁই হয় না বৃদ্ধ বাবা মার। কি নিদারুণ বেদনাদায়ক নির্মম কথা!
পেশাগত সাফল্য অর্জনের নামই কি সফলতা? নাকি প্রকৃত সফলতা নিহিত থাকে মানবিকতা দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সমঝোতা ও পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্যে?

২০২১ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ও প্রবীণ হিতৈষী সংস্থা ‘হেল্প এইজ ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের এক যৌথ গবেষণা ও সমীক্ষার তথ্যমতে, বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলোতেও প্রায় একই রকমের তথ্য উঠে এসেছে যেখান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার ফলে প্রবীণদের একাকীত্ব ও অবহেলার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রবীণদের মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রবীণ মানুষ তীব্র একাকীত্ব, বিষণ্ণতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলার শিকার হচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক জীবনের তীব্র ব্যস্ততা, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ ও মোবাইল আসক্তি, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারণের কারণে পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হচ্ছেন। নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় ঘরের নোংরা, ছত্রাকযুক্ত ও আবর্জনাময় পরিবেশ; যা প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিয়েছে এবং প্রবীণদের প্রতি আমাদের চরম অবহেলাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

আমাদের আবহমান কালের সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের কারণে আগে প্রবীণদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে পরবর্তীতে শিথিলতা পরিলক্ষিত  হওয়ায় রাষ্ট্রও বসে থাকেনি। এ বিষয়ে আইন করে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১৩ সালে এই বিষয়ে “পিতামাতার ভরণপোষণ আইন” নামে এ আইনটি পাস হয়। ওই আইনে বলা হয়েছে প্রতিটি সামর্থ্যবান ছেলে-মেয়েকে তার বাবা-মায়ের ভরণপোষণ যথা: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা প্রদানসহ অন্যান্য  প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।” আইনে এটাও বলা হয়েছে যে কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে  ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সন্তানদেরকে তাদের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করতে হবে। বাবা মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাদেরকে কোন বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না। আইনে এও বলা আছে ছেলেমেয়ের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা তাদের বৃদ্ধ দাদা-দাদি বা নানা-নানির দেখাশোনা করবেন। আইন অমান্য করলে অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা জরিমানা ও তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

কিন্তু কথা হলো যেখানে হৃদয়ের আইন রুদ্ধ, মায়া-মমতা, ভালোবাসা অবহেলিত সেখানে রাষ্ট্রীয় আইনের ভয়ে কতটা দায়িত্ব বা শ্রদ্ধা তৈরি হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। যে বাবা-মাকে আইন-আদালত করে ভরণ পোষণ ও শ্রদ্ধা ভালোবাসা নিতে হয় তাদের মতো দুর্ভাগা আর কে আছে? তাছাড়া বাবা-মারা এত ক্ষমাশীল ও উদার হন যে, নিজেদের জন্য সন্তানদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান এমন বাবা-মার সংখ্যা বিরল।

আজকের সন্তান আগামী দিনের বাবা-মা। আজকের নবীন আগামীর প্রবীণ। সুতরাং তারা প্রবীণদের সাথে যেমন আচরণ করবেন আগামীতে হয়তো তেমনটিই অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। এ কথাটি মাথায় রেখে সবার উচিত বাবা-মা ও প্রবীণদের প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা ও সম্মান প্রদর্শন করা। কোনো বাবা মায়ের জীবনে যেন এমন করুণ পরিণতি আর না ঘটে। শুধু সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষা নয় প্রকৃত, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সুষ্ঠু সমাজ গঠন ও সামাজিক সচেতনতা তৈরীর মাধ্যমে সুন্দর পারিবারিক বন্ধন গড়ে উঠুক এটিই আজকের প্রত্যাশা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মহাস্থান মাহীসওয়ার কলেজ, বগুড়া, কবি ও প্রাবন্ধিক। মেইল: profrazzaque1@gmail.com

আরও পড়ুন

  • উপ সম্পাদকীয় এর আরও খবর