
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : একটি সেতু কখনো শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করে না; কখনো কখনো এটি বদলে দেয় মানুষের জীবনযাত্রার গল্প। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা, জোয়ার-ভাটার দুর্ভোগ আর অনিশ্চিত পারাপারের দিন পেরিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের জোড়খালী ও আঠারবেকীর মানুষের জীবনে তেমনই এক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই গ্রামের যোগাযোগের পথে নির্মাণ করা হয়েছে কাঠের/বাঁশের সেতু। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন শুধু একটি পারাপারের পথ নয়—দুর্ভোগের মধ্যে পাওয়া স্বস্তির একটি প্রতীক।
দীর্ঘদিন ধরে খাল পারাপারে স্থানীয়দের নির্ভর করতে হতো নৌকা কিংবা জোয়ার-ভাটার ওপর। বর্ষা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠত। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, কৃষিপণ্য ও মাছ বাজারে পৌঁছানো—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তির শেষ ছিল না।
বিশেষ করে জরুরি সময়ে এই বিচ্ছিন্নতা অনেকটা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াত। কোনো রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নেওয়ার প্রয়োজন হলে অপেক্ষা করতে হতো নৌযানের জন্য। শিক্ষার্থীদের অনেকেই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাঠের সেতু নির্মাণের পর সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অল্প সময়েই দুই গ্রামের মানুষ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক নিরাপদে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে। কৃষক ও জেলেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান আহমদ বলেন,এই সেতু হওয়ার আগে আমাদের দুর্ভোগের শেষ ছিল না। বিশেষ করে বর্ষার সময় মনে হতো আমরা যেন মূল জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। রোগী নিয়ে যেতে হলে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় লাগত। এখন সেতু হওয়ায় আমাদের চলাচলে অনেক স্বস্তি এসেছে। আমরা ইউএনও স্যারসহ উপজেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞ।
আঠারবেকীর বাসিন্দা রাশেদ বলেন,আগে এপার-ওপারের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ থাকলেও যাতায়াতের কষ্টের কারণে অনেক সময় প্রয়োজন ছাড়া কেউ আসা-যাওয়া করত না। এখন কয়েক মিনিটেই পার হওয়া যায়। বাজারে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, স্কুল-কলেজে যাতায়াত—সবকিছু সহজ হয়েছে। তবে আমাদের দাবি, এই কাঠের সেতুর জায়গায় ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করা হোক।
স্থানীয়দের মতে, সেতুটি নির্মাণের পরে শুধুযোগাযোগব্যবস্থাই সহজ হয়নি; দুই গ্রামের সামাজিক সম্পর্কেও এসেছে নতুন প্রাণ। আগে যে পথ পাড়ি দিতে সময় ও ঝুঁকি দুটোই ছিল, এখন সেখানে মানুষের চলাচল বেড়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পারস্পরিক যোগাযোগও বাড়ছে।
হাতিয়া এমনিতেই নদী, খাল ও বিচ্ছিন্ন জনপদের কারণে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি। জোয়ার-ভাটা ও নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে এখানকার মানুষ বছরের পর বছর জীবনযাপন করে আসছেন। ফলে ছোট একটি সেতুও স্থানীয়দের কাছে হয়ে ওঠে বড় স্বস্তির কারণ।
তবে কাঠের সেতু যতই মানুষের দুর্ভোগ কমাক, এটি স্থায়ী সমাধান নয়—এ কথা মানছেন স্থানীয়রাও। বর্ষা, জোয়ারের স্রোত কিংবা কালবৈশাখীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কাঠের এই সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।তাই দুই গ্রামের মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা বর্তমান সেতুটিকে ভবিষ্যতে একটি টেকসই কংক্রিটের সেতুতে রূপ দেওয়া।
স্থানীয়দের ভাষায়, কাঠের সেতু তাদের বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে সাময়িক আলো জ্বালিয়েছে। এখন সেই আলোকে স্থায়ী করতে প্রয়োজন একটি মজবুত সেতু।
প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত এই ছোট্ট সেতু তাই শুধু কাঠ-বাঁশের কয়েকটি তক্তার সংযোগ নয়; এটি দুই গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, দুর্ভোগ ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নতুন পথের নাম।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, “জোড়খালী ও আঠারবেকীর মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কাঠের সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের চলাচলে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে। তবে কাঠের সেতু স্থায়ী সমাধান নয়। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এখানে একটি টেকসই ও স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।”
আপনার মতামত লিখুন :