
উপজেলা প্রতিনিধ, হাতিয়া : লুটেরা সন্ত্রাসীরা চাঁদা না পেলে চলে হামলা লুটপাট। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে করা হয় জখম। আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা শেষে মামলা করেন এমন এক ভুক্তভোগী। মামলা করার দায়ে করা হয় এলাকা ছাড়া। অপহরন করে জিম্মি করে রাখা হয় বাদীকে। দীর্ঘ একমাস এলাকার বাইরে অবস্থান করতে হচ্ছে পুরো পরিবারকে। সহযোগিতা চেয়েও নদীর ওপারে হওয়ায় আইন শৃংখলা
বাহিনীর সহয়তা পাননি তিনি। কথাগুলো বলেছেন জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ২নং চানন্দী ইউনিয়নের বালু ব্যবসায়ী ফরহাদ উদ্দিন। সম্প্রতি ফরহাদ উদ্দিনের (৫০) সাথে দেখা হয় চানন্দী ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে দরবেশ বাজারে। সাংবাদিকদের দেখে নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কাঁধতে কাঁধতে সাথে থাকা আহত ছেলের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন গুলো দেখান তিনি। এসময় এলাকার
অনেকে ফরহাদের পক্ষে সমবেদনা জানাতে দেখা যায়। ফরহাদের বাড়ী চানন্দী ইউনিয়নের করিম বাজারের পাশে। সন্ত্রাসীদের ভয়ে এখনো বাড়ী যেতে পারছেনা। ফরহাদ জানান, অনেকদিন থেকে বালুর ব্যবসা করে আসছেন তিনি। হাসিনা সরকার পতনের পর স্থানীয় ও বহিরাগত মিলে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছে। ঘটনারদিন সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীরা করিম বাজার এসে সাউন্ডবোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে সব
অন্ধকার করে পেলে। এসময় বাজারের একটি দোকানে থাকা তার ছেলে ও নুরউদ্দিন (২৫) নামে এক প্রতিবেশিকে পিঠিয়ে আহত করে। সন্ত্রাসীরা তার ছেলের মাথায় কুপিয়ে আহত করে। প্রতিবেশী নুরউদ্দিন বাঁচাতে এলে তাকে পিটিয়ে ডান হাত ভেঙ্গে দেয়। দুজনের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। একমাস পর এসে ৫ নভেম্বর ৮জনকে আসামী করে হাতিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহন করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানাকে আদেশ দেন। কিন্তু
একমাস পার হয়ে গেলেও পুলিশ কোন আসামী গ্রেফতার করতে পারেনি। আরো জানান, এদিকে মামলা করার পর সন্ত্রাসীরা তাকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। কিছুদিন আগে সন্ত্রাসীরা তাকে ভূমিহীন বাজারে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে থানারহাট বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। চানন্দী ইউনিয়নটি হাতিয়া উপজেলার মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানে কোন ঘটনা হলে মামলা করতে নদী পাড়ি দিয়ে হাতিয়া উপজেলা সদরে যেতে হয়। ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে থানার হাট একটি পুলিশ ফাঁড়ি আছে। কিন্তু ৫ আগষ্টের পর এলাকায় পুলিশ সদস্যদের তেমন একটা কার্যক্রম নেই।
স্থানীয়রা জানান, শুধু ফরহাদ উদ্দিনের সাথে নয় পুরো ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব চলছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর উপস্থিতি না থাকায় সন্ত্রাসীরা এসব কর্মকান্ড করে যাচ্ছে। ৫ আগস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগে একটি গ্রুপ পুরো চরের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এদের অনেকের বাড়ি পার্শ্ববর্তী সুবর্ণচর উপজেলায়। তারা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর করিম বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাউন্ড বোমার বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বেশ
কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে তারা এলাকায় মোহড়া দেয়। তাদের ভয়ে সাধারন মানুষজন আতঙ্কে থাকে।
৫ আগষ্ট পরবর্তী সারা দেশে আইন শৃংখলার চরম অবনতি হলে সরকার সেনা ও নৌবাহিনীকে মাঠে নামায়। দেওয়া হয় ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতা। আর হাতিয়া উপজেলার জন্য দেওয়া হয় নৌবাহিনী, এই বাহিনীর ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয় হাতিয়ার মূল ভূ-খন্ডে উপজেলা সদরে। এতে হাতিয়ার মূল ভূ-খন্ডের ৯টি ইউনিয়ন ও একটি
পৌরসভায় নৌবাহিনীর তদরকিতে কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আসলেও অরক্ষিত থেকে যায় চানন্দী ও হরনী ইউনিয়ন ।
চানন্দী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের নাসিরপুর গ্রামে বসবাস করেন কৃষক নবির উদ্দিন। নবীর জানান, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার ৮ সদস্যের সংসার। গত মাসের প্রথম দিকে একদল সন্ত্রাসী তার বাড়িতে হামলা করে। এতে প্রাণ ভয়ে নবির ও দুই ছেলে পালিয়ে যায়। পরে সন্ত্রাসীরা তাদের খোয়াড়ে থাকা দুইটি গরু নিয়ে যায়।
এদিকে বাড়ীর বাহিরে অবস্থান করা ছেলেরা জীবিকার অন্বেষায় মাছধরা ট্রলারে চুক্তিভিত্তিক কাজ নেয়। তার কিছুদিন পর নবিরের বড় ছেলে একসন্তানের জনক বজ্রপাতে মাছধরার ট্রলারে নিহত হন।নবীর আরো জানান, এই ঘটনার সাথে জড়িত অনেকের বাড়ি সূবর্ণচর উপজেলায়। রকি, মাছুদ কেরানি, ফারুক ডাক্তার সহ অনেকে আছেন যাদের বাড়ি হাতিয়ার সীমান্ত এলাকায়। বেলাল উদ্দিন চানন্দী ইউনিয়নের
১ নং ওয়ার্ডের সাবেক প্রশাসনিক মেম্বার। ২০০৮ সালে ইউনিয়ন ঘোষণারপর দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রশাসনিক মেম্বার ছিলেন তিনি। আলাপ কালে বেলাল জানান, পুরো ইউনিয়নে নৈরাজ্য চলছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম একেবারেই অনুপস্থিত। আইন শৃংখলা বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে ওঁৎ পেতে থাকা সীমান্ত এলাকার সন্ত্রাসীরা পুরো এলাকায় রাজত্ব করছে। কেউ কেউ বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম করছে। এখানে
বিএনপির শক্ত কোন সাংগঠনিক কাঠামো নেই। এই সুযোগে যে যার মত করে বিশৃংখল ভাবে কার্যক্রম করছে। সারা দেশে নৌবাহিনী ও সেনা বাহিনী আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে। অথচ এই ইউনিয়নে ৫ আগষ্টের পর থেকে পর্যন্ত এই বাহিনীর কোন সদস্য বা টিম আসেনি। অনেকে হাতিয়া উপজেলা সদরে গিয়ে নৌবাহিনীর ক্যাম্পে আইনগত সহায়তার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু নদী পাড়ি দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহনে বাহিনীর
কেউ এলাকায় আসেনি। চানন্দী ইউনিয়ন পূর্ব শাখার সভাপতি মাহবুবের রহমান জানান, দলের মধ্যে কিছু অনুপ্রবেশকারী যোগ দিয়ে এসব অপকর্ম করছে। এছাড়া চানন্দী ইউনিয়নটি বড় এরিয়া। এর একপাশে সুবর্ণচর উপজেলা। সেখান থেকেও সন্ত্রাসীরা এসে অপকর্ম করছে। এদিকে চনন্দী ইউনিয়নের পাশাপাশি হরনী ইউনিয়নেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। হরনী ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে রামগতি উপজেলার সাথে
সীমানা বিরোধ অনেক দিন থেকে। হরনীর পশ্চিম পাশে তিনটি ওয়ার্ড দীর্ঘদিন রামগতির কিছু জলদস্যুর নিয়ন্ত্রনে ছিল। এই এলাকার মানুষজন দস্যুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। তিন বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর এ অবস্থার অবসান ঘটে। কিন্তু ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর টাংকি বাজার থেকে পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত মানুষজন আবার পরাধীন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ড পুনরায় দস্যুরা নিয়ন্ত্রনে নেয় ।
এখানে নতুন করে কেউ ব্যবসা শুরু করলে দস্যুদের মোটা অংকের অর্থ দিতে হয়। আবার অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও দখল করে নিয়েছে দস্যুরা। টাংকি বাজার মাছ ঘাটটিও তারা দখল করে নেয়। ডিসেম্বর এলাকায় এসব অপকর্মের প্রতিবাদে গণ জমায়েত করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হরনী ইউনিয়ন শাখা। হরনী ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে অনুষ্ঠিত এই গন জমায়েতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন
সংগঠনের হাতিয়া উত্তর শাখার সভাপতি আবু যর গিফারী সুমন। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর সারা দেশ স্বাধীন হলেও হাতিয়ার হরণী ইউনিয়ন স্বাধীন হয়নি। এই ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে সন্ত্রাসীরা রাজত্ব করছে। তারা আওয়ামীলীগ সময়ে আওয়ামীলীগের হয়ে কাজ করতো, এখন তারা বিএনপি নেতা কর্মীদের সমর্থন নিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মাছ ঘাট দখল করে নিয়েছে।
আগে এই ইউনিয়নের টাংকি বাজার ও মাইন উদ্দিন বাজারে দু’টি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। এখন এই দু’টি পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে সন্ত্রাসীরা সহজে তাদের অপকর্ম করে যাচ্ছে। তিনি এই দুটি পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম চালু করারও দাবী জানান। এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক খোকন বলেন, চানন্দী ইউনিয়নসহ হাতিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা কাজ করছি। হরণী- চানন্দীতে
বহিরাগত কিছু সন্ত্রাসী অনিয়ম করে আসছে। এই বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আগেও সতর্ক করা হয়েছে। কেউ যেন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে বিশৃংখলা করতে না পারে সে বিষয়ে আমরা সতর্ক অবস্থায় আছি।
এই ব্যাপারে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, হরনী ও চানন্দী নামে
দুটি ইউনিয়ন নদীর ওপারে। মূল ভূ-খন্ড থেকে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর। আমাদের যানবাহন এবং জনবলও সংকট রয়েছে। যার কারণে অন্য উপজেলার কিছু লোক এসে এখানে অপকর্ম করছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে আমলে নিচ্ছি।
আপনার মতামত লিখুন :