প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪

সাবেক এমপি আনোয়ার খান ব্যাংক লুটেরার একজন

Oplus_131072

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের শেয়ার বাজারে কারসাজি ও ঋণের নামে ব্যাংক লুটের অভিযোগ উঠেছে লক্ষীপুর-১ আসনের সাবেক এমপি আনোয়ার খানের বিরুদ্ধে। ফারইষ্ট ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, শাহ জালাল ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ ও শেয়ার বাজার কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন তিনি। গড়েছেন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ। পুরো আওয়ামী শাসন আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে লুটেছেন ব্যাংক খাত ও

শেয়ার বাজার। তথ্য বলছে, ২০০৯- ২০১০ সালে আনোয়ার খান ‘বাল্ক ট্রানজ্যাকশন’- এর মাধ্যমে অতি সহজে ‘আর্টফিসিয়াল একটিভ ট্রেডিং এনভায়রনমেন্ট’ সৃস্টি করে বাজারে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেন। তিনি ‘দি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯- এর ১৭ (ই) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে মুনাফা করেন। সেসময় পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটি অনিয়মের জন্য আনোয়ার খান সহ বেশ কয়েকজনকে সরাসরি অভিযুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় পুঁজি বাজারে সিরিয়াল ট্রেড, অনৈতিক ভাবে শেয়ার ব্লক সহ নানা কারসাজির

মাধ্যমে শেয়ার বাজার থেকে হাতিয়েছেন কোটি-কোটি টাকা। আনোয়ারের উত্থান যেভাবে: ১৯৬১ সালে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চনপুরের পূর্ববিঘা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা ছাকাওয়াত ‍উল্লা খান ফকিরাপুল এলাকায় ফুটপাতে পুড়ি-পেয়াজু বিক্রি করতেন। ২৭ বছর বয়সে আনোয়ার লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ বাজারে ওষুধের দোকান দিয়ে বসেন। পরে ব্যবসা বাদ দিয়ে যুক্ত হন বিএনপির মনোনীত লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অষ্টম জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা আনোয়ার সহজেই

জিয়াউল হকের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। পরে তার সহকারী হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত হতে থাকেন। নানা ভাবে সুবিধা গ্রহণ করতে থাকেন বিভিন্ন মহল থেকে। ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১২০ কোটি লুট: ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসলে ন্যাশনাল ব্যাংক চলে যায় সিকদার গ্রুপের হাতে। সে সময় নিয়ম নীতি বহির্ভূতভাবে ১২০ কোটি টাকার অনৈতিক লোন হাতিয়ে নিতে আনোয়ার খান প্রতিষ্ঠা করেন তাকাফুল ইসলামী বীমা লিমিটেড। পরে সিকদার গ্রুপের রন হক সিকদার ও রিক

হক সিকদারের সহায়তায় তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্স লিমিটেডের ৮৬ হাজার ৩৫৫ টি শেয়ার ব্লক করে ১২০ কোটি টাকার লোন নিয়েছিলেন তিনি। ২০১৭ সালেও নিয়মবহিভূত ভাবে ৩ লাখ শেয়ার ব্লক করেন। ব্যাংকে লোন থাকা অবস্থায় রিয়ালাইজ গেইন থেকে টাকা উত্তোলণ করা নিয়মবহিভূত। তবে আনোয়ার খান নিয়মের তোয়াক্কা না করে ন্যাশনাল ব্যাংকের একটি বিও একাউন্ট থেকে ৪৬ কোটি ৫৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ও অপর আরেকটি একাউন্ট থেকে ৪৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা উত্তোলণ করেন। বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকে তার অনৈতিক লোন রয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকা। যা তিনি বিনিয়োগ করে আসছেন শেয়ার মার্কেট ও নিজের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

ফারইষ্ট ফাইন্যান্স থেকে অর্থ আত্মসাত: আনোয়ার খান ফারইস্ট ফাইন্যান্স এন্ড লিমিটেডের পরিচালকের দায়িত্বে থেকেও লুটেছেন প্রতিষ্ঠানকে। ফারইষ্ট ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবসিডিয়ার প্রতিষ্ঠান ফারিস্ট স্টক এন্ড লিমিটেডের নামে ৪৭০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় আনোয়ার খানের সম্পৃক্ততা পেয়েছে দুদক। এছাড়া ঋণের ৮ কোটি ৬১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের এসএভিপি ও হেড অব ফিন্যান্স এইচআর মো. আনোয়ার হোসেন সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেডের ৫০ শতাংশ শেয়ার (৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা) দ্বিগুণ মূল্যে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকায় মূল প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের কাছে বিক্রি দেখানো হয়েছিল। ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেডের ৬ জন শেয়ার হোল্ডারদের মধ্যে এম এ খালেক, এম এ ওয়াহাব ও আনোয়ার হোসেন খান সরাসরি ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে জড়িত। ২০০৯ সালে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ নিয়ে ব্রোকার হাউস টি যাত্রা শুরু করে। এস এফ বি এল লিমিটেডের উদ্যোক্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য

আনোয়ার খান। সে সময় ছয় উদ্যোক্তার মধ্যে বিশ শতাংশ শেয়ার ছিল আনোয়ার হোসেন খানের। ৩১ টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে ৪৭০ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়। মুল টাকা ফারিস্ট ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের হলেও এর মাধ্যমে ওই টাকা প্রতিষ্ঠানের নামে ছাড় করানো হয়। ২০১০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এই টাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়া অফিস ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন আসবাবপত্র ক্রয়ের নামে ৭০ কোটি টাকার বেশি নয়ছয় হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণ মিলেছে দুদকের অনুসন্ধানে। যমুনা ব্যাংক থেকে ১৩৩ কোটি: ২০২২ সালের জুনে কেন্দ্রীয়

ব্যাংকের অনাপত্তি নিয়ে ধানমন্ডিতে অবস্থিত আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের ১২৪ কোটি টাকার ঋণের পুনঃতফসিল অনুমোদন করে যমুনা ব্যাংক। কিন্তু সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্ত ছিলো বিআরপিডির সার্কুলার নং ১৫/২০১২ এর শর্ত পরিপালন করতে হবে। ওই সার্কুলারের ২(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পুনঃতফসিল করেতে হলে সুদসহ ঋণের ৩ কিস্তির সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংককে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু ঋণ পুনঃতফসিল হলেও সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেনি আনোয়ার

খান মডার্ন হাসপাতাল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের ১২৪ কোটি টাকার ঋণের ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬টি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেনি। এসব কিস্তিতে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধ করার কথা ছিলো ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বর্তমানে আনোয়ার খান মর্ডানের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তথ্য বলছে, যমুনা ব্যাংক আনোয়ার খান মর্ডান থেকে ঋণ আদায় না করলেও ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ঋণটি পুনঃতফসিল বাবদ প্রায় ১১ কোটি টাকা আয় খাতে নেওয়া হয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং ১৪/২০১২ এর ৩ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে নামে-বেনামে ঋণ: ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড (এসজেআইবিএসএল)-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন আনোয়ার হোসেন খান। সেসময় নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে ঋণ দিয়ে হাতিয়েছেন কয়েকশো কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম ভঙ্গ করে আনোয়ার হোসেন খানের যোগসাজসে ব্যাংকটি ২০১৯ সালের জুন শেষে মোট আমানতের ৯৯.০২ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মে বলা আছে, দেশে কার্যরত প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো সংগৃহীত মোট আমানতের মধ্যে সিআরআর ও

এসএলআর বাবদ জমা রেখে সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৩.৫০ টাকা ঋণ বিতরণ করতে পারবে। আর ইসলামী ব্যাংকগুলো ৮৯ শতাংশ অর্থাৎ ১০০ টাকা সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৯ টাকা ঋণ দিতে পারবে। কিন্তু শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সীমা মানেনি। তারা আগ্রাসী ব্যাংকিং অব্যাহত রেখেছে। ২০১৯ সালের জুন শেষে এ ব্যাংকের মোট আমনত সংগ্রহ ছিল ১৮ হাজার ৬৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে আন্তঃব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে আসে ১৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আর এ সময়ে ব্যাংকটি মোট ঋণ বিতরণ করেছে ১৮ হাজার ৪৮৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৮ সালের জুন ভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে সময়ে শাহজালাল ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১৬ হাজার ১২ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে আন্তঃব্যাংক লেনদেন থেকে নেওয়া ২৪২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এসময়ে ব্যাংকটি ঋণ বিতরণ করেছে ১৬ হাজার ৬৪৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকটি আমানতের চেয়ে ৬৩৩ কোটি টাকা বেশি বা ১০৩.৯৫ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। ২০১৭ সালের জুন ভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকটি ঝুঁকির মধ্য দিয়ে ঋণ বিতরণ

অব্যাহত রাখে যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে। ২০১৭ সালের জুন শেষে ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১৩ হাজার ২২৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর এ সময়ে ব্যাংকটি ঋণ বিতরণ করেছে ১৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা অর্থাৎ ২২১ কোটি টাকা বেশি বা ১০১.৬৭ শতাংশ দাঁড়ায় এডিআর রেশিও। এদিকে ঋণ সম্পর্কিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আনোয়ার হোসেন খানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকার শেষ বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুনের শেষে শাহজালাল ব্যাংকের

খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছিলো ১১৬১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা ২০১৭ সালের জুনে ছিল ৬৩৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। শতাংশীয় হিসাবে যার বৃদ্ধি ৮১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। পরবর্তীতে অনিয়ম-দুনীতিগ্রস্ত ব্যাংক হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে বিশেষ তদন্ত পরিচালনায় নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেসময় শাহাজালাল ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে তদন্তে বেশ কিছু অনিয়ম উদঘাটন হয়। তবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের মনোনীত সংসদ সদস্য হওয়ায় থেকে যান ধারছোয়ার বাইরে। ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০ কোটি লোপাট: ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করলে ইসলামী ব্যাংকে পরিবর্তনের

দাবিটি জোরালো হয়। নিবিড় তদারকির উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে ব্যাংকটিতে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে এস আলম গ্রুপই ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এস আলম গ্রুপের সাথে মডার্ণ গ্রুপের ব্যবসায়ীক সুসম্পর্ক ছিলো আগে থেকেই। ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের ৮০ হাজার কোটি টাকা লুটের অন্যতম সহযোগী ছিলেন সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন খান। করোনাকালীন সময়ে এস আলম পরিবারের চার ভাই ও এক ভাইয়ের স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়। সেসময় ঢাকার ধানমণ্ডিতে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার

সুবাদে আনোয়ার খানের সাথে সখ্যতা বাড়ে এস আলম পরিবারের। সেই সুবাদে ২০১৮ সালে ইসলামী ব্যাংক থেকে আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজের জন্য ৭০ কোটি টাকা ঋণের নামে লোপাট করেন আনোয়ার খান। আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজের অনিয়ম: লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন খানের মালিকানায় ধানমন্ডি এলাকার সুউচ্চ ভবনে গড়ে উঠেছে ৭৫০ শয্যার আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ। তিনি আবার বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সাধারণ সম্পাদক। দেশে কভিড-১৯ মহামারি, ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়া যাই আক্রমণ

করুক সব মৌসুমেই স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যবসা বানিয়ে উপার্জন করেছে এ হাসপাতালের মালিকপক্ষ। করোনাকালে এ হাসপাতালের বিরুদ্ধে ৩০ মিনিটে ৮৬ হাজার টাকার অক্সিজেনের বিল নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই প্রতিষ্ঠানটিতেও অনিয়মের শেষ নেই। অপচিকিৎসা, অতিরিক্ত বিল করা, করোনার চিকিৎসায় রোগীদের থেকে বেশি অর্থ হাতিয়ে, ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যু সহ নার্স-চিকিৎসকদের বেতন আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের বিরুদ্ধে। ১৩ দিনে ৩৩ লাখ টাকা বিল, তবু ভুল চিকিৎসায় রোগিনীর মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও ডাক্তারের আদালতে মামলাও হয়েছিলো।

মামলায় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন খান, চেয়ারম্যান (আনোয়ার হোসেন খানের স্ত্রী) তাহমীনা আফরোজ ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ডা. এমএ কাহারকে আসামি করা হয়েছে। আনোয়ার হোসেন খান একদিকে ছিলেন এমপি, অন্যদিকে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকও। তাঁর ক্ষমতার দাপটে হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই তদন্ত পর্যায়ে পর্যন্ত যেত না। এখন নিয়মিত রোগী ভর্তি,

অপারেশন, টেস্ট সব চললেও চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতে গড়িমসি করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কয়েক মাস ধরে অনিয়মিত বেতন দিতে গিয়ে কারও দুই মাস, কারও তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। সেই বেতনের দাবিতে গত ১৮ নভেম্বর বিক্ষোভ করেছে হাসপাতালটির নার্স ও মেডিকেল অফিসারেরা। স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, স্বৈরশাসন চলে আসছে প্রতিষ্ঠানটিতে। দীর্ঘদিন যাবৎ অনিয়মিত বেতন দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে মেডিকেল অফিসারদের বাকি রয়েছে তিন

মাসের বেতন। নার্স-চিকিৎসকদের বেতন নিয়ে নয়-ছয় করে প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতালের কর্মীদের নিয়ম অনুযায়ী বেতন না দিয়ে সেটা অন্য জায়গায় ব্যবহার করেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন খান । আনোয়ারের ব্রোকারেজ হাউসে জরিমানা: সময়ের পালা বদলে আনোয়ার হোসেনের নানা কারচুপি সামনে আসতে শুরু করেছে। ১৯ নভেম্বর আনোয়ার হোসেনের ব্রোকারেজ হাউস মডার্ন সিকিউরিটিজ এবং আনোয়ার সিকিউরিটিজকে অর্থদণ্ড দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মডার্ন সিকিউরিটিজকে ১ লাখ টাকা এবং আনোয়ার সিকিউরিটিজকে ৫

লাখ টাকা জরিমানা করেছে কমিশন। প্রতিষ্ঠান দুটির সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি থাকার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ৯৩২তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আনোয়ারের যত সম্পত্তি: আনোয়ার হোসেন শেয়ার বাজার ও বিভিন্ন ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকায় গড়েছেন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিনেছেন জমি-ফ্লাট-বাড়ি। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান ও এমপি নির্বাচিত

হওয়ার পরে তা বেড়েছে কয়েকগুনে। সূত্র বলছে, শুধুমাত্র ধানমন্ডিতেই কিনেছেন অর্ধশতাধিক বাড়ি। ২০০৫ সালে তিনি আনোয়ার খান মডার্ণ হাসপাতাল লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। গড়েছেন আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, আনোয়ার খান মডার্ণ ইউনিভার্সিটি, আনোয়ার খান মডার্ণ নার্সিং কলেজ ,আনোয়ার খান মডার্ণ ড্রেজিং করপোরেশন, মডার্ণ ডায়াগনস্টিক

সেন্টার লিমিটেড, হাজী সাখাওয়াত আনোয়ারা আই হসপিটাল, মডার্ণ হোল্ডিংস লিমিটেড এবং ম্যারিগোল্ড হোল্ডিংস। এছাড়াও শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, এস এফ বি এল লিমিটেডের উদ্যোক্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, তাকাফুল ইসলামী বীমা লিমিটেডের চেয়ারম্যান সহ প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠানের সাথে দায়িত্বে রয়েছেন।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর