
কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কবিদের কবিতায় বার বার উঠে এসেছে।মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কি পরিমাণ কবিতা লেখা হয়েছে তা একটি গবেষণার বিষয়। শিল্প সাহিত্যের নানা মাধ্যামে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিরা তাদের হৃদয় উৎসারিত চরণ রচনা করেছেন বহু বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। কবিদের কলমেই প্রথম প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে। ঊনিশ শ একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিলো বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এক গৌরবগাঁথা। হাজারো প্রাণের আত্মাহুতি আর অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম হরিয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, লাল সবুজের ঐ পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা, বেদনার করুণ আর্তনাদ, হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন, বীরের আত্মত্যাগ, দেশ মাতৃকার জন্য মানুষ যেভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো তা এক অপার বিস্ময়। রনাঙ্গণে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রণোদনা দিয়েছিল গান কবিতা। একটি নতুন জাতি-রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে আমরা যাত্রা করেছি একটি নতুন পৃথিবীর দিকে। আর অনিবার্যভাবে এ যাত্রাপথে শিল্প-সাহিত্যের নানা মাধ্যমের উপস্থিতি মুখ্য হয়ে ওঠে। আমাদের-ভাস্কর, চিত্রশিল্পী, গল্পকার, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, সংগীতশিল্পী, সকলেই মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে তাঁদের সৃজনপ্রতিভার উৎসারণ ঘটিয়েছেন। কবিরা কবিতা লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধেও নানা অনুসঙ্গ কবিতায় ধরা দিয়েছে বহুমাত্রিকতায়। কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ অথবা মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে এবার প্রসঙ্গে
ফিরে যাই…। বাংলা কবিতার অন্যতম দিকপাল জসীম উদদীন তাঁর ‘মুক্তিযোদ্ধা’
কবিতায় লিখেছেন- -‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, মৃত্যু পিছনে আগে ভয়াল বিশাল নখর মেলিয়া দিবস রজনী জাগে- কখনো সে ধরে রেজাকার বেশ, কখনো খান-সেনা, কখনো সে ধরে ধর্ম লেবাস পশ্চিম হতে কেনা
কখনো সে পশি ঢাকা-বেতারের সংরক্ষিত ঘরে ক্ষেপা কুকুরের মরণ কামড় হানিছে ক্ষিপ্ত স্বরে।’
আমরা চলেছি রক্ষা করিতে মা- বোনের ইজ্জত শত শহীদের লোহুতে জ্বালানো আমাদেও হিম্মত…। পল্লী কবি খ্যাত জসীম উদ্দীন তাঁর বহু কবিতায় এভাবেই তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রসঙ্গ। নারী জগরণের পথিকৃৎ ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। তাঁর ‘উদাত্ত বাংলা’ কবিতায় তাঁর আশান্বিত উচ্চারণ-
-‘সাতকোটি সন্তানের স্বেদে অবগাহি বাংলার জননী আছে উর্ধ্বমুখে চাহি সে প্রভাত তরে- মুক্তির আলোক শিখা পশিবে যে প্রতি ঘরে ঘরে। সেই শুভদিন লাগি পথ চাহি জাগে। জননী-ভগিনী-বধূ বিধাতার আশীর্বাদ মাগে।
সুফিয়া কামাল তাঁর ‘আজকের বাংলাদেশ, একত্রিশে চৈত্র ১৩৭৭, কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।
আহসান হাবীব তাঁর ‘স্বাধীনতা’ শীর্ষক কবিতায় বলেন,-
-‘আমি অতঃপর সরোবর এবং নদীকে
ডেকে ডেকে যখন মিনতি করি
এস, আমার সমস্ত বুকে
বুক পুড়ে স্বাধীনতা হও
সারা বুকে ছড়াও অথবা
মায়ের দোলনা হও…।’
সিকান্দার আবু জাফর তাঁর – ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতায় অবিনাশী প্রত্যয়ে
বলেন,-
– ‘রক্ত চোখের আগুন মেঘে ঝলসে যাওয়া
আমার বছর গুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয়
কন্ঠনালীর খুনপিয়াসী ছুরি
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে
কেউটে সাপের ঝাঁপি।
আমার হাতেই নিলাম আমার
নির্ভরতার চাবি;
তুমি আমার আকাশ থেকে
সরাও তোমার ছায়া
তুমি বাংলা ছাড়ো…।’
সিকান্দার আবু জাফর ‘তখন রাত্রিশেষ’ নামে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক অসামান্য একটি
কবিতা লিখেছিলেন।
শামসুর রাহমান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিল্পসম্মত বেশ কিছু কবিতা
লিখেছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কবিতা হচ্ছে, ‘এখানে দরজা ছিল’,
‘সম্পত্তি’, ‘পথের কুকুর’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’,
‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তুমি বলেছিলে;, ‘কাক’ প্রভৃতি।
‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’- কবিতায় শামসুর রাহমান লিখেছেন,-
– ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খান্তÍবদাহন?
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।
হাসান হাফিজুর রহমান-মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কবিতা রচনা করেছেন। তখন সকল
শব্দই’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন,-
– ‘আমার নিশ্বাসের নাম স্বাধীনতা
আমার বিশ্বাসের নখর ক্রোধের দারুণ রঙে রাঙানো
দু:স্বপ্নের কোলবন্দী আমার ভালবাসা
এখন কেবলই
এক অহরহ চিৎকার-হত্যা কর- হত্যা কর- হত্যা কর।
আবদুল গাফফার চৌধুরী তার – ‘আমার দুখিনী বাংলা’ কবিতায় লিখেছেন,-
– ‘আমার দুখিনী বাংলা
মা, তুই আমার জননী
তোর ওই আকাশে চাঁদ
আর দিনে হাসে দিনমণি।
তবু তোর চোখে কেন অশ্রুভরা জল
মা তুই অহল্যা হলি
কার শাপে বল?
আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁর ‘ঘাতক ১৯৫’ কবিতায় লিখেছেন-
– ‘তিরিশ লাখ হত্যা সাড়ে তিন লাখ ধর্ষণ পঞ্চাশ হাজার অগ্নিসংযোগ এবং লুঠ অগুণিত কিন্তু ঘাতক মাত্র ১৯৫ জন শুভঙ্কর কোথায় জন্মেছিল? নিশ্চয়ই প্রাচ্যভূমি যেখানে জীবনটা
আয়নার উল্টোপিঠ; এবং ইতিহাস দস্যুর উপাখ্যান…।
সৈয়দ শামসুল হক আমাদের প্রধান লেখকদের একজন তাঁর গল্প, কবিতা, উপন্যাস,
নাটকে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য কুশলতায় ধরা দিয়েছে। ‘জগন্নাথ হল’, কবিতায়
লিখেছেন,-
– ‘দুলে দুলে উঠছে ফুলের অজস্র পতাকা
ওধাও ছাত্রদের মাঠে
ঘাসের বেয়নেটগুলো আকাশের দিকে স্থির
পাশেই
ছিন্ন একটা স্তনের বোঁটা মুখে
সমস্ত নিস্তব্ধতায়
দীর্ঘ ছাড়া ফেলে
সৈনিক
সুর্যাস্তের প্রতিফলন তার দাঁতে।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ- মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসাধারণ কিছু কবিতা লিখেছেন।
আরো কত রক্ত দিতে হবে কবিতায় তিনি বলেন,-
– ‘বারবার মনে পড়ে
রক্তের মাটি খুঁড়ে লেখা
কবিপয় কথামালা
যা কখনো ছাপা হয় নাই
যাঁর লেখা সেই তিনি অকালপ্রয়াত
মুলত সাংবাদিক
এবং সে সুবাদেই এই দেশে আগমন
অসীম রায়ের-।’
আল মাহমুদ-এর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধেরদ প্রসঙ্গ এসেছে বহুবার। ‘অসহ্য সময়
কাটে’ কবিতায় লিখেছেন,-
– ‘আমিও অন্তরক্ত হয়ে যাই হঠাৎ তখন
জনতার সমুদ্রের সাথে
বাঘের হাতের মতো সনখ শপথ
সোহাগের গাড় ইচ্ছা নিয়ে
নেমে আসে মনের ওপর।
নির্মম আদও পেয়ে আমিও রক্তাক্ত হব
বরকেতের শরীরের মতো?
বেলাল চৌধুরী- ‘শহীদদের প্রতি’ কবিতায় লিখেন-
– ‘তোমাদের যা বলার ছিল
বলছে কি তা বাংলাদেশ?
শেষ কথাটি সুখের ছিল?
ঘৃণার ছিল?
নাকি ক্রোধের
প্রতিশোধের
কোনটা ছিল?
রফিক আজাদ- আমাদের প্রধান কবিদের একজন। তাঁর বহু লেখায় মুক্তিযুদ্ধ ও
স্বাধীনতার প্রসঙ্গ এসছে। ‘নেবে স্বাধীনতা’, কবিতায় তিনি লিখেছেন-
– ‘নেবে স্বাধীনতা? – নাও তোমাকে দিলাম
অপার আকাশ-উড়বে যদি একটি বেলুন দেব,
হিলিয়াম গ্যাস- ভরা রঙিন বেলুন-
মধ্য আকাশের বায়ুস্তর ভেদ করে তুমি বেশ
নিশ্চিন্তে পেরিয়ে যাবে বাংলার আকাশ…।’
শামসুল ইসলাম তাঁর- ‘বসন্ত সম্পাতে এক নারী’ কবিতায় লিখেছেন-
‘তোমার মুখের দিকে চেয়ে আমি
মুখের আদল
এই মুখ হতে খুলে ফেলি
তোমার কন্ঠের গান এই কন্ঠে মিশে যায় যদি
ঘুরি একা একা উদাসীন।
এখনই সাক্ষাৎ দেবে এই পথে
বসন্ত সম্পাতে
এক নারী
অদ্বিতীয়- আমি তাকে চাই
তাই তোমাকে নেব না
তুমি যাও।’
নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর
‘আগ্নেয়াস্ত্র’ কবিতায় লিখেছেন-
-‘পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্ধিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভিত মানুষের
শর্টগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ যেন দরগায়
স্বীকৃত মান্ধসঢ়;তÑ টেবিলে ফুলের মতো মাস্তানের হাত।’
মহাদেব সাহা তাঁর ‘তোমার জন্য কবিতায়’ লিখেছেন-
-‘তোমার জন্য জয় করেছি একটি যুদ্ধ
একটি দেশের স্বাধীনতা
তোমার হাসি, তোমার মুখের শব্দগুলি
সেই নিরালা- দূর বিদেশে আমার ছিল
সঙ্গী এমন
অস্ত্র কিংবা যুদ্ধজাহাজ ছিল না তো সেসব কিছুই
ছিল তোমার ভালবাসার রাঙা গোলাপ
আমার হাতে…।’
হাসান হাফিজ তাঁর ‘না’ কবিতায় লিখেছেন অবিনাশী এক পঙ্ধসঢ়;ক্তি। কবিতার
শেষ চরণটি হচ্ছে,-
– ‘না, আমরা কাপুরুষ নই,- না।’
এ নিবন্ধের লেখক প্রত্যয় জসীম তার বহু কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে
ধরেছেন। ‘সিঁদুরসন্ধ্যা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
– সিঁদুর সন্ধ্যাগুলো কাঁদে এখনো
মৃত্যুর আনন্দ মিছিলে
মিশে গ্যাছে যারা বুঝেছে তারা
প্রিয় পতাকার রং কেন লাল
সিঁদুর সন্ধ্যা আমি তোমার জন্য
কাঁদি নিরবে নিরবে
কাঁদবো হাজার বছর ধরে…।’
প্রবীণ কবিদের পাশাপাশি এভাবে নতুন প্রজন্মের কবিদের কবিতাতেও মুক্তিযুদ্ধের
প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। অনাগত দিনের কবিরাও তাদের কলমের ঠোঁটে তুলে ধরবেন
আমাদের শ্রেষ্ঠতম বৃহত্তম অর্জন স্বাধীনতার স্বপ্নগাঁথা। কবিরা স্বপ্ন দ্যাখে
একটি সুন্দর স্বদেশের। স্বাধীনতার সুফল যেন সব মানুষের প্রাণের গ্রহীনে দোলা
দিয়ে যায় সেই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক : প্রত্যয় জসীম : কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক
আপনার মতামত লিখুন :