প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২৯ জানুয়ারি, ২০২৫

সুবর্ণচরে সিমের বাম্পার ফলন, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া ও নদীভাঙনে চিন্তিত কৃষক

হাবিবুর রহমান রনি, সুবর্ণচর : জেলার উপকূলীয় উপজেলা সুবর্ণচরে চলতি শীত মৌসুমে শিমের ভালো ফলন হয়েছে। শত শত হেক্টর জমিতে শুধু শিম আর শিম। যেন শিমের রাজ্য সুবর্ণচর। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় শিম চাষ করেন উপজেলার হাজারও কৃষক।

শীত মৌসুমের অন্যতম প্রধান সবজি শিম। চলতি মৌসুমে জেলার শস্যভাণ্ডার খ্যাত সুবর্ণচরের বিস্তীর্ণ মাঠ, জমি ও ঘেরের আইলে সর্জন পদ্ধতিতে মাচায় শিম চাষ করা হয়েছে।

উপজেলার মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক ইউনিয়নের যেদিকে দৃষ্টি যায়, সেদিকেই সবুজ-বেগুনী রংয়ের শিমের সৌন্দর্য। তবে এখনও ফুল আসায় চলতি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় একইরকম ফলন হবে। চলতি মৌসুমের পুরোটাজুড়ে থাকবে শিমের এই আবাদ।

যদিও এ পর্যন্ত কয়েক দফা শিমের ফলন তোলা হয়েছে। তবে শিমের বিচির ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিশেহারা কৃষক-কৃষাণীরা। অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানা যায়, প্রান্তিক কৃষক তার উৎপাদিত শিমের বিচি বাজারজাত করতে গেলে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত মূল্য থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন শতশত কৃষক।

সরেজমিন চরক্লার্ক ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কৃষকরা বিক্রয় উপযোগী শিমের বিচি সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বাজারজাত করতে মাচা থেকে তারা আহরণ করছেন শিম। কৃষকরা মাচা থেকে আহরণকৃত শিম বাড়ির উঠানে ঢেলে গ্রুপে গ্রুপে নারী শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে বিচি সংরক্ষণ করছেন। বিচিগুলো বস্তায় ভরে ঠেলাগাড়ি ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় সোলাইমান বাজারসহ নিকটস্থ বাজারে। এ বাজারে রাখা শিমের বিচি পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে ধর কষাকষি করে বিক্রি করছেন তারা। পাইকাররা তা কিনে বস্তাভর্তি করে ট্রাকযোগে নিয়ে যাচ্ছেন শহরের বিভিন্ন বাজারে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল এভাবেই জমে ওঠে শিমের বাজার।

স্থানীয় কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এবার শিমের বাম্পার ফলন হয়েছে। অধিক ফলনের পরও হতাশ তারা। গত বছর এই সময়ের তুলনায় এবার শিমের বিচির দাম অনেক কম। এতে উৎপাদন খরচ উঠলেও তেমন লাভ হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

স্থানীয় গ্রামের শিম চাষি কেফায়েত জানান, এ বছর শিম উৎপাদন বেশি হলেও দাম অনেক কম। পাইকাররা প্রতি কেজি শিমের বিচি ৬৫ টাকা করে কিনলেও শহরে, নগরে-বন্দরে শিমের কেজি ৭৫-৮০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, আমি চলতি মৌসুমে ভালো দামের আসায় ঝুঁকি নিয়ে বাড়ির চতুর্দিকে ৫ একর জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির শিম চাষ করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ন্যায্যমূল্য পেলে তার দ্বিগুণ লাভবান হওয়ার আশা করছি। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে লাভ তো দূরের কথা আরো দুই লাখ টাকা লস গুণতে হবে মনে হচ্ছে।

শুভ নামের আরেক শিম চাষি আমাদের জানান, স্থানীয় পাইকাররা সিন্ডিকেট তৈরী করে শিমের দাম কমিয়ে দেয়। তারা বাহির থেকে আসা পাইকারদের শিম কিনতে বাধা দেয়। এতে করে কৃষকরাই দাম কম পায়। এসবের প্রতি ক্ষোভ থাকায় প্রায় ২-৩ দিন শিম উত্তোলন বন্ধ রেখে বিক্ষোভও করেছেন শত শত কৃষক। তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের মনিটরিং রাখা উচিত বলেও জানান তিন।

তিনি আরো বলেন, প্রতিনিয়ত নদীভাঙ্গনের ফলে অনেক কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে যার ফলে কৃষি উৎপাদন আগের তুলনাই কমে আসছে। গত ১২ বছরে মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙনে ৩০ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা নদীভাঙ্গন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

মাসুম হোসেন নামের এক স্কুল শিক্ষক বলেন, জেলার দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় উপজেলা এই সুবর্ণচর। এখানে শুধু শিম চাষ না। সব ধরনের সকল প্রজাতির সবজির রাজ্য এ সুবর্ণচর। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় শহর অঞ্চলের বড় বড় পাইকার ব্যবসায়ীরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ের কৃষক থেকে সবজি সংগ্রহ করতে পারে না। উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা একটু নজরদার হলে সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হবে। এবং এখানকার সবজি দেশ বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। এতে প্রকৃত কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, স্থানীয় বড় বড় ব্যবসায়ীরা গ্রামের কৃষকদেরকে চুক্তি (দাদন) হিসেবে নগদ অর্থ ও জমিসহ শিম চাষাবাদের জন্য বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে থাকেন। এক কথাই প্রান্তিক কৃষকরা শিম চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাদনকারীর অধিনে বন্ধী হিসেবে থাকতে হয়। একারনে শিম বা শিমের বিচির দরদাম উঠা নামা হলেও ন্যায্য দাম পায় না তারা। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে যৌথভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি দাম নির্ধারণ করে শতশত খুচরা বিক্রেতাকে প্রতিনিয়ত এভাবে ঠকাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর উপজেলায় ৩৪১৩ হেক্টর জমিতে শিম উৎপাদন হলেও এ বছর ৫৭৭৬ হেক্টর জমিতে শিম উৎপাদন হয়েছে। আবাদি জমির পাশাপাশি অনেক অনাবাদি জমিতেও শিম লাগিয়েছেন কৃষকেরা। আর এর বেশির ভাগই উৎপাদন হয়েছে চরক্লার্ক ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী কৃষকরা শিম চাষ করায় এ বছর উপজেলায় শিমের অধিক ফলন হয়েছে। আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাবে এবং নদীভাঙ্গন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে তারা কথা বলবেন বলে জানান।

শিমের বিচি সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি, দ্রুত সমাধানের জন্য উপ-সহকারী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। এবং গত দু’দিন পূর্বে আমি নিজেই মাঠ পরিদর্শন করেছি। প্রান্তিক কৃষকসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে সম্মিলিত ভাবে সিন্ডিকেট সমাধানের জন্য আমরা দ্রুত বসবো। তবে কৃষকদের সকল ধরনের সুবিধার্থে আমরা কৃষি বিপনন অধিদপ্তর ও স্থানীয়দের আর্থিক সহযোগীতায় পৃথক পৃথক স্থানে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে (কালেকশন পয়েন্ট) নামে ৬টি আধুনিক মার্কেট তৈরী করে দিয়েছি। আশাকরি এই পয়েন্টের মাধ্যমে কৃষকদের সব সমস্যা সমাধান হবে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর