প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১ জুলাই, ২০২৫

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের জাদুঘর আজ অন্ধকারের প্রতীক

মোহাম্মদ হানিফ, নিজস্ব প্রতিনিধি : ১৯৭১। সেই অগ্নিঝরা দিনে নিজের রক্ত দিয়ে কেনা এই মাটি, এই স্বাধীনতা। যে সাতজন সূর্যসন্তান জীবন সঁপে দিয়ে আমাদের আজকের এই পতাকা এনে দিয়েছিলেন, তাঁদেরই একজন আমাদের অহংকার, জাতির শ্রেষ্ঠ বীর বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তাঁর আত্মত্যাগের অমর স্মৃতিকে ধরে রাখতে, নতুন প্রজন্মকে জানাতে, সোনাইমুড়ীর বাগপাচড়া গ্রামে ২০০৮ সালের ২০ জুলাই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। কিন্তু আজ সেই গৌরবের স্মারক নিজেই এক মৃত্যুপুরীর রূপ নিয়েছে। যে জাদুঘর জাতির বীরকে নিয়ে গর্ব করার কথা, সেটিই এখন পরিচর্যা আর সম্মানের অভাবে ধুঁকছে, যেন বীরের আত্মা সেখানে নীরবে কাঁদছে, আমাদের বিবেকের দরজায় আঘাত করছে। এ কেমন নির্লিপ্ততা. এ কেমন অবহেলা আমাদের শ্রেষ্ঠ বীরের প্রতি. এই অবহেলা কি আমরা সইতে পারি?

এককালের সম্ভাবনাময় এই স্মৃতি কেন্দ্রটি এখন কেবলই ধুলোমলিন, নীরব, দর্শনার্থীশূন্য এক ভূতুড়ে বাড়ি। স্থানীয়দের দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে জাদুঘরের ভগ্নদশায়, তাদের চোখে স্পষ্ট হতাশার ছবি। সরকারিভাবে নির্মাণ হলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। গ্রন্থাগারের বইগুলো জীর্ণ, অপ্রাসঙ্গিক আর বাতিল প্রায়, যেন সময়ের ধুলোমলিন চাদরে ঢেকে গেছে জ্ঞানের আলো। ভেতরের যন্ত্রপাতির কোনো অস্তিত্বই নেই, আর দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে পুরোনো প্লাস্টার, যেন প্রতিটি ফাটল ধরে গড়িয়ে পড়ছে আমাদের জাতীয় লজ্জা!

আগে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে পাঠচক্র আর ইতিহাস পাঠের জন্য আসতো, প্রাণবন্ত ছিল এই জায়গা। কিন্তু সেসব এখন কেবলই স্মৃতি, ধূসর এক স্বপ্ন। দর্শনার্থীর অভাবে, কার্যক্রমহীনতায় দিন দিন প্রাণহীন হয়ে পড়ছে এক সময়কার এই জীবন্ত স্মৃতি কেন্দ্র। এ যেন এক বীরের সমাধি, যেখানে জীবিতরা বিস্মৃত প্রায়! একটি জাতি কতটা উদাসীন হলে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি এমন অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে? এই অবহেলা আমাদের জাতিসত্তার প্রতি চরম উপহাস ছাড়া আর কী।

জাদুঘরের এই করুণ দশার পাশাপাশি, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের জন্মভূমি সোনাইমুড়ী থেকে নান্দদিয়াপাড়া হয়ে মুহুরিগঞ্জগামী সড়কটিও চরম অবহেলিত। যে পথ দিয়ে পর্যটক বা দর্শনার্থীরা জাদুঘরে আসবেন, সেই রাস্তাটি এতটাই ভাঙাচোরা যে চলাচল করাই দুঃসাধ্য, যেন পথিকের মৃত্যুফাঁদ! স্থানীয়রা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যে বীরের নামে আমরা গর্ব করি, তাঁর স্মৃতির কাছে পৌঁছানোর পথই যদি এমন নাজেহাল হয়, তাহলে কে আসবে এখানে। এই বেহাল রাস্তা যেন আমাদের জাতীয় উদাসীনতারই প্রতিচ্ছবি, এক কলঙ্কিত ইতিহাস। এই অবহেলা কি কেবল রাস্তার, নাকি আমাদের চেতনারও পচন ধরেছে?

স্থানীয়দের আর্তনাদ.এমন অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না! বিবেকের ঘুম ভাঙবে কবে।

একজন প্রবীণ শিক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এমন একজন গৌরবময় বীরের স্মৃতি রক্ষার এই স্থানটি অবহেলায় পড়ে থাকবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকার চাইলেই এটিকে জাতীয় পর্যায়ে একটি শিক্ষামূলক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। কিন্তু কবে। তার কণ্ঠে মিশে আছে গভীর হতাশা আর অব্যক্ত যন্ত্রণা।

সোনাইমুড়ীর সরকারি ডিগ্রী কলেজের আমির হোসেন বলছেন, আমরা ইতিহাস বইয়ে পড়ি, কিন্তু অনুভব করতে চাই কাছ থেকে। এই জাদুঘরটি হতেই পারতো আমাদের অনুপ্রেরণার কেন্দ্র। কিন্তু এখন এখানে এলে মনটাই খারাপ হয়ে যায়, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়, চোখে পানি আসে। তাদের এই কষ্ট কি আমাদের কানে পৌঁছাবে না। তাদের এই নীরব কান্না কি প্রশাসনের ঘুম ভাঙাবে না।জাতীয় উদ্যোগের অপেক্ষায়. আর কতকাল এই লজ্জা সইব।

এলাকাবাসী বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের স্মৃতিকে সসম্মানে বাঁচিয়ে রাখতে দাবিগুলো জানিয়েছেন, যা আজ আর শুধু দাবি নয়, এটি জাতির প্রতি আহ্বান. জাদুঘরটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার.এক ইঞ্চি জীর্ণতাও যেন না থাকে। অভিজ্ঞ গাইড ও প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ. যাতে বীরের গল্প জীবন্ত থাকে। আধুনিক মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরশ্রেষ্ঠের জীবন তুলে ধরা. যাতে প্রতিটি কণা কথা বলে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত ভ্রমণ কার্যক্রম চালু করা. যেন নতুন প্রজন্ম শেকড়কে চিনতে পারে। জাদুঘরের পাশে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং প্রতি বছর মুক্তিযুদ্ধ উৎসবের আয়োজন করা. যেন এই স্থান উৎসবের কেন্দ্র হয়, শোকের নয়। সোনাইমুড়ী থেকে নান্দদিয়াপাড়া হয়ে মুহুরিগঞ্জ সড়কটির জরুরি মেরামত ও আধুনিকীকরণ. যেন বীরের পথে কাঁটা না থাকে।

দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন শুধু নোয়াখালীর নয়, গোটা বাংলাদেশের অহংকার। তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা মানে আমাদের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা, নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা। বীরের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই জানানো হবে, যখন তাঁর স্মৃতি সংরক্ষিত হবে পরম যত্নে, আর সেই গল্প পৌঁছাবে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অবিলম্বে এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আর কতকাল আমরা এই অবহেলা দেখে যাব? একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমেই বদলে যেতে পারে এই স্মৃতিধন্য স্থানটির ভাগ্য, ঘুচতে পারে আমাদের জাতীয় লজ্জা!

আমরা কি আমাদের বীরদের এই অবহেলা মেনে নিতে পারি? সম্মিলিতভাবে আমরা এই নীরব আর্তনাদকে একটি গণদাবিতে পরিণত করি, যাতে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন চিরভাস্বর থাকেন, আর তার স্মৃতিস্তম্ভ অবহেলায় ধুঁকে ধুঁকে মরে না যায়।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর