প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১৩ জুলাই, ২০২৫

ভূমধ্যসাগরের কবরে নিশানের ইতালি স্বপ্ন, মায়ের আহাজারিতে ভারী আকাশ-বাতাস!

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ইউরোপের পথে পা বাড়ানো নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর তরুণ নজরুল ইসলাম নিশান (২২) এখন ভূমধ্যসাগরের অতলে নিখোঁজ। গত ২ জুলাই ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পর এক ট্রলার দুর্ঘটনায় নিভে যায় তাঁর সব স্বপ্ন। দীর্ঘ ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি। নিশানের পরিবারে এখন শুধুই শোকের মাতম, আর তাঁর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। তিনি দেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ড. ইউনূসের হস্তক্ষেপ কামনা করে আকুতি জানাচ্ছেন তাঁর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরল, যেখানে দালালদের মরণফাঁদে প্রতিনিয়ত বলি হচ্ছে শত শত তরুণের জীবন।

নিখোঁজ নজরুল ইসলাম নিশান সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ ও নুর নাহার দম্পতির মেঝো সন্তান। পরিবারের দারিদ্র্য দূর করতে প্রায় এক বছর দুই মাস আগে তিনি লিবিয়ায় পাড়ি জমান। সেখান থেকে নিয়মিত টাকা পাঠিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতেন। গত ২ জুলাই রাতে পরিবারের সঙ্গে নিশানের শেষ কথা হয়। সেদিন তিনি ইতালির উদ্দেশে ট্রলারে যাত্রা শুরুর কথা জানান। এরপর থেকেই তার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

ছেলের খোঁজ না পেয়ে নিশানের মা নুর নাহার কাঁদতে কাঁদতে যেন জ্ঞান হারানোর পথে। তাঁর চোখে আর পানি নেই, কেবল শূন্য দৃষ্টি আর পাথর হয়ে যাওয়া বুক। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বারবার বলছেন, ১১ দিন ধরে আমার ছেলের কোনো খবর পাই না। আমি আর পারছি না। আল্লাহ আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও! আমি ড. ইউনূস স্যারের হস্তক্ষেপ চাই।

নিশানের বাবা নুর মোহাম্মদও শোকে পাথর। তিনি বলেন, আমার ছেলে কোথায় আছে, বাঁচলো না মরল কিছুই জানি না। যে ট্রলারে ছিল, তাতে ৬০ জন যাত্রী ছিল। কেউ কেউ উদ্ধার হলেও অনেকেই এখনো নিখোঁজ। আমাদের এলাকার আরেক তরুণ হাছানও তার সঙ্গে ছিল, সেও নিখোঁজ। দোয়া আর অপেক্ষা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। আমার ছেলের জীবন ভিক্ষা চাই।
প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা

নিশান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুরো সোনাইমুড়ী এলাকায় শোকের মাতম চলছে। মসজিদ ও মাদরাসায় তার জন্য বিশেষ দোয়া করা হচ্ছে। নিশানের মামাতো ভাই মো. তারেক জানান, পুরো বাড়িতে এখন একরকম শোকাবহ পরিবেশ। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি। সরকারের উচিত দ্রুত নিখোঁজদের খোঁজ নেওয়া ও উদ্ধার প্রক্রিয়া চালানো।

জেলা ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. খুরশীদ আলম জানান, নিশানের পরিবারের লিখিত আবেদন তারা পেয়েছেন এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গত কয়েক বছরে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে অসংখ্য বাংলাদেশি তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। দালালচক্রের প্রতারণা, ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা এবং সরকারি নজরদারির ঘাটতি এই মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘ করছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখনই সময় সচেতন হওয়ার। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবখানে মানবপাচারের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেওয়া অত্যাবশ্যক। দালালদের খপ্পরে পড়ে এভাবে তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া বন্ধ করতে এবং অর্থনৈতিকভাবে সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে মানুষদের বাঁচাতে, এই মরণফাঁদ বন্ধ করতে এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নিশানের মতো আর কত স্বপ্ন ভূমধ্যসাগরের অতলে হারিয়ে গেলে আমরা এই মানবপাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো?

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর