
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া : হাতিয়া উপজেলার নলচিরা ঘাট এলাকায় তদারকির অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নদীভাঙন রোধে ব্যবহৃত জিও ব্যাগ। কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের আওতায় নদীভাঙন ঠেকাতে এসব ব্যাগ স্থাপন করা হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যাগগুলো ছিঁড়ে গিয়ে নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হক সাহাব জানান, নদীভাঙন রোধে কিছুদিন আগে নলচিরা ঘাট এলাকায় শত শত জিও ব্যাগ ফেলা হয়। কিন্তু কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকি না থাকায় ব্যাগগুলো অল্প দিনের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ভাঙন রোধের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে, ঝুঁকির মুখে পড়েছে স্থানীয় জনপদ, ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আর কোনো নজরদারি নেই। ব্যাগগুলো ছিঁড়ে গিয়ে নদীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে। এতে সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় হওয়ার পাশাপাশি ভাঙনের ভয়াবহতাও দিন দিন বেড়ে চলেছে।
তাছাড়া চেয়ারম্যান ঘাটসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সি-ট্রাক, ট্রলার, স্পিডবোট ও অন্যান্য নৌযান নিয়ম মেনে ঘাটে না ভিড়ে সরাসরি জিও ব্যাগের ওপর দিয়েই যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা করছে। এতে ব্যাগগুলোর সঙ্গে ধাক্কা লেগে সেগুলো বারবার ছিঁড়ে যাচ্ছে। ফলে ঘাটের স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ছে এবং যাত্রীদের ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, এভাবে চলতে থাকলে নদীভাঙন ঠেকাতে বসানো জিও ব্যাগগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। এর ফলে ঘাট ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিতে পারে। তাই জরুরি ভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, জিও ব্যাগগুলো রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের অসচেতনভাবে মোটরসাইকেল চালানো, মালামাল ওঠানামা করা, এমনকি ধূমপানের আগুনে এসব ব্যাগ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ব্যাগের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে উপকূল সুরক্ষার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের ধারণা, এ অবস্থা চলতে থাকলে অল্পদিনের মধ্যেই ব্যাগগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়বে।
নলচিরা ইউনিয়নের জাকারিয়া জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, হাতিয়া প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ। তাদের প্রস্তাব, অন্তত ২–৩ জন দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিয়োগ দিয়ে প্রতিদিনের তদারকি নিশ্চিত করা হলে ব্যাগগুলো দীর্ঘদিন অক্ষত রাখা সম্ভব হবে।
সরাসরি সি-ট্রাক, ট্রলার ও স্পিডবোট জিও ব্যাগের ওপর ভিড়ানো এবং যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইজারাদারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. মাহেরুল ইসলাম বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ যে পল্টন ও জেটি নির্মাণ করেছিল, তা কয়েক মাস আগে জোয়ারের পানিতে ভেঙে গেছে। ফলে পল্টন ও জেটির মাধ্যমে যাত্রী বা মালামাল ওঠানামা এখন একেবারেই অসম্ভব। এক কথায় বলতে গেলে এটি সম্পূর্ণ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। আমরা বিষয়টি জানি ও বুঝি, তবে সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়েই সবাইকে সচেতনভাবে জিও ব্যাগের ওপর দিয়েই ওঠানামা করানো হচ্ছে, যেন ব্যাগগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তিনি আরও বলেন, “এই বিষয়ে আমাদের একটি টিম আছে, যারা জিও ব্যাগের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে কোনো ব্যাগ নষ্ট না হয়। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএকে জানিয়েছি, তারা দ্রুত মেরামতের কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে আমাদের জানিয়েছে।”
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী,জানান অতিরিক্ত পানি থাকে মেরামতের কাজ শুরু করা যায়নি, তবে অল্প সময়ের মধ্যে মেরামতের কাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জানান, অতিরিক্ত পানি থাকায় নির্ধারিত সময়ে মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে পানি নেমে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই মেরামতের কাজ শুরু হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল আহমেদ বলেন, “বাপাউবো নোয়াখালীর আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত হাতিয়ার নলচিরা ঘাট এলাকায় ৫০০ মিটার জিও ব্যাগ দ্বারা অস্থায়ী জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে স্পিডবোট, ট্রলার ইত্যাদি এসব ব্যাগের ওপর নোঙর করায় ব্যাগগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ঘাট এলাকার দুই পাশে আরও ৫৫০ মিটার প্রতিরক্ষামূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।”
তবে রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, “এর দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের।”
আপনার মতামত লিখুন :