
উপজেলার প্রতিনিধি, সুবর্ণচর : সুবর্ণচর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের সড়ক এখন যেন দুর্ঘটনার আরেক নাম। একসময় যে রাস্তাগুলো দিয়ে মানুষ নিশ্চিন্তে চলাচল করত, আজ সেই রাস্তাগুলোতে চলা মানেই ভয় আর দুর্ভোগের যাত্রা। কাদা-পানিতে ভরা গর্ত, ভাঙা কালভার্ট, ধসে পড়া ইট-বালির রাস্তা — এই দৃশ্য এখন সুবর্ণচরের মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। উপজেলার সর্বত্র একই চিত্র, কোথাও রাস্তার ইট উঠে গেছে, কোথাও মাটির নিচে ডেবে গেছে পুরো পথ, কোথাও আবার গাড়ির চাকার চাপে রাস্তার বুক ফেটে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত।
সুবর্ণচর উপজেলার মোট ৮টি ইউনিয়ন—চর জব্বার,চর জুবিলী, চর বাটা, পূর্ব চর বাটা, চর আমান উল্যাহ, চর ওয়াপদা, চর ক্লার্ক, এবং মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষ আজ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে। ইউনিয়নটি একেবারে পূর্ব দিকে অবস্থিত এবং এটি পুরোপুরি নদী তীরবর্তী এলাকা।
চর বাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা খোকন বলেন, “এই রাস্তায় গাড়ি তো দূরের কথা, হেঁটেও যাওয়া যায় না ঠিকমতো। একদিন বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা ডোবা হয়ে যায় পুরো পা পানি ও কাঁদা মাটিতে হাটা অনুপযোগী হয়ে পড়ে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তা সংস্কারের আশ্বাস তারা বহুবার পেয়েছেন, কিন্তু কাজের কোনো বাস্তব প্রতিফলন তারা দেখেননি। চর ক্লার্ক ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, “প্রতিবার নির্বাচন এলে সবাই রাস্তা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু নির্বাচনের পর কেউ খোঁজ নেয় না।”
খাসের হাট থেকে আক্তার মিয়ার হাট পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি প্রথম নির্মিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। এটি একসময় সুবর্ণচরের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা ছিল, কারণ এর মাধ্যমে উপজেলার চর বাটা, চর ক্লার্ক, চর ওয়াপদা ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষ উপজেলা সদর ও আশেপাশের বাজারে যাতায়াত করত। কিন্তু আজ এই সড়কটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রথমে ইট-সোলিং করা হয়েছিল, পরবর্তী এই সড়ক গুলোতে পিচ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পরে তা উঠে গিয়ে জায়গায় জায়গায় গর্তের সৃষ্টি হয়। গত কয়েক বছরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় এখন পুরো রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পরে কাদা জমে থাকে হাঁটু পর্যন্ত, গাড়ি বা রিকশা চলা তো দূরের কথা, মানুষকেও হেঁটে যাওয়া কষ্টকর হয়ে যায়। খাসের হাট বাজারের ব্যবসায়ী আলা উদ্দিন বলেন, “আমরা প্রতিদিন পণ্য আনি-নেই এই রাস্তা দিয়ে, কিন্তু এখন রিকশাও কাদা থেকে টেনে তুলতে হয়। অনেক সময় লোক পড়ে যায়, আহত হয়। রাতের বেলায় তো ভয় লাগে চলতে।”
গত তিন বছরে সুবর্ণচরের বিভিন্ন সড়কে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১২ জন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৬০ জনের বেশি মানুষ। চরজব্বর, চর জুবিলী–চর বাটা, চর ক্লার্ক–চর ওয়াপদা, চর আমান উল্যাহ, মোহাম্মদপুর ও খাসের হাট থেকে আক্তার মিয়ার হাট সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে পানিতে ঢেকে থাকা গর্ত চোখে না পড়ায় মোটরসাইকেল বা রিকশা উল্টে পড়ে যায়। চর আমান উল্যাহ ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম জানান, “গত বছর আমার ছোট ভাই এই রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল, রাস্তা ভাঙা থাকায় গর্তে পড়ে আহত হন। পরবর্তীতে সে এখন অচল হয়ে পড়ে রয়েছে।
অবস্থা এমন যে, এখন সুবর্ণচরের সড়কে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বেশির ভাগই গ্রামের সড়ক চলাচলের অনুপযোগী। গ্রাম থেকে হাই স্কুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছু টা হলে ও দুরে যার কারণে ঝুঁকি নিয়ে গাড়িতে চলাচল করে স্কুলে যেতে হয়।
এদিকে সড়কের এই বেহাল দশার কারণে স্থানীয় অর্থনীতিও বিপর্যস্ত। কৃষকরা উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়ছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে দ্বিগুণেরও বেশি। রিকশা, অটোরিকশা বা ট্রাক চালকরা এই রাস্তায় চলতে ভয় পান। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে হলে গাড়ি করে নিলে তার অসুস্থ শরীর আর অসুস্থ থাকে না। কারণ এই সড়কে ভালো মানুষ চলাচল করলে ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক সমাজের অভিযোগ, তারা বহুবার উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর (LGED) ও সড়ক ও জনপথ বিভাগে আবেদন করেছেন, কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চর ক্লার্ক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জানান, “আমরা অনেকবার চিঠি দিয়েছি। প্রতিবার আশ্বাস পাই, কিন্তু কাজের দেখা মেলে না। রাস্তা সংস্কার ছাড়া মানুষের কষ্টের শেষ হবে না।”
উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খাসের হাট–আক্তার মিয়ার হাট সড়কটি সংস্কারের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অর্থ বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানান। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বরাদ্দ পেলেও কাজের গতি ধীর হলে পরবর্তী বর্ষায় আবারও পুরো সড়ক তলিয়ে যাবে এবং দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
অন্যদিকে নদী তীরবর্তী মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষ এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। নদীভাঙনে রাস্তা ভেঙে পড়ে, আবার কিছু অংশ নদীতে তলিয়ে যায়।অন্য দিকে উপজেলা শহর ও জেলা শহরে চলাচল করার ও ভালো সড়ক নেই।
মোহাম্মদপুর সুবর্ণচর উপজেলা একবারে দক্ষিনাঞ্চলে হওয়া এটি থেকে উপজেলায় চলাচলের মুল সড়ক হলো আক্তার মিয়ার হাট টু খাসের হাট সড়ক টি। এটি দীর্ঘ প্রায় এক যুগ আগে নির্মাণ হলে ও উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। যার কারনে যেখানে গর্ত হচ্ছে যেখানে ভেঙে পড়েছে সড়ক।
বেলাল নেতা নামে মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের এক বাসিন্দা জানান- আমরা অনেক কারণে উপজেলায় যায় কিন্তু যদি সিএনজিতে উপজেলায় যাওয়া হয় তাহলে শরীরের অবস্থা অন্য রকম হয়ে পড়ে। যেন সুস্থ শরীর টা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
সুবর্ণচর উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন – আমরা যেহেতু রাজনীতি করি, আর আমি উপজেলা রাজনীতির সাথে জড়িত আমাকে অনেক জায়গায় যেতে হয় কোন সড়ক কেমন আমি কম বেশি জানি। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রয়েছে আক্তার মিয়ার হাট টু খাসের হাট সড়ক টি। কারণ এই সড়কে কোন রকম চলাচল করলে ও খাসের হাটের পূর্ব পাশের যে অংশ খালে পড়ে যাচ্ছে এটি খুবই ভয়ানক মরণ ফাঁদ। কারণ এখানে প্রতিদিন কম বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা চাই সুবর্ণচরের এই সকল অবহেলিত সড়ক সংস্কার করা হোক।
খাসের হাট টু আক্তার মিয়ার হাট সড়কে সিএনজি চালক তালুক জানান- এক সময় গ্যাস লাগতো অল্প কয় টাকার ভাড়া ও কম ছিলো সময় ও কম লাগতো এখন রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ার আমাদের আর দুর্দশার শেষ নেই। কারণ কোনো দিন সিএনজি নাট পড়ে যায় কোনো দিন কিছু অংশ ভেঙে যায়। কারণ এক জায়গায় ভাঙা সড়ক হলে চলতো এখনো তো পুরো সড়ক ই অনুপযোগী।
তাছাড়া সুবর্ণচরের গণমাধ্যম কর্মী রাশেদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন- আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে বলতে আমার বড় ভাইয়ের আদরের ছেলে আমার ভাতিজা ৫ বছর বয়সী সে পানিতে পড়ে যাওয়া আমরা দ্রুত উপজেলা হাসপাতালে মোটরসাইকেল যোগে নেওয়া সময় সে পথে মারা যায়। যদি সড়ক টি ভালো হতো তাহলে তো আমাদের এতো বেশি সময় ও লাগতো না আমার ভাতিজাকে ও বাঁচানো যেত।
মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বিএনপির এক নেতা বলেন- আমাদের এখানে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে উপজেলা নেওয়ার আগে সে মারা যাবে। কারণ এখানে আধা ঘণ্টা লাগতো এখানে এখন এক ঘন্টার ও বেশি সময় লাগে। আমরা চাই সরকারের পক্ষ থেকে রাস্তা গুলো সংস্কার করা হোক।
মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের এক বাসিন্দা জানান- আমাদের সড়ক ও অনুপযোগী আমাদের একটা যদি হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে আমাদের ঝুঁকি টা ও কমে যাবে।
সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাবেয়া আফসার সায়মা জানান- আমরা আবেদন পেয়েছি মন্ত্রনালয়ে আবেদন গুলো পাঠানো হয়েছে। সরকার যদি সংস্কার করার বাজেট অনুমোদন করে আমরা চাইবো অতিদ্রুত ভেঙে যাওয়া সড়ক গুলো সংস্কার করতে।
নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ শাহাজাহান বলেন- আমি যখন এমপি ছিলাম সুবর্ণচরের প্রধান প্রধান সড়ক গুলো আমার হাত ধরে উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের দল জাতীয়তাবাদী বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে ইনশাআল্লাহ আমরা এই অবহেলিত সড়ক গুলো সংস্কার করবো।
এই সড়কগুলোর অবস্থা শুধু পরিবহন নয়, জনজীবনের প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলছে। কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা—সবকিছুই স্থবির হয়ে গেছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে নেওয়া, কৃষকদের বাজারে ফসল বিক্রি—সবকিছু এখন দুর্ভোগের আরেক নাম।
সুবর্ণচরের মানুষ এখন সরকারের কাছে একটাই দাবি জানাচ্ছে—অবিলম্বে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সংস্কার করা হোক, রাস্তার পাশে সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হোক এবং টেকসইভাবে পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হোক। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, “নোয়াখালীর সুবর্ণচর নামটা যেন কাগজে না থাকে, উন্নয়নের সুবর্ণ আলোয় আলোকিত হোক আমাদের জীবন।”
রবিবার সুবর্ণচরের প্রতিটি সড়ক যেন মানুষের দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুঃখ আর বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এই ভাঙা রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষ, হারাচ্ছে জীবন, হারাচ্ছে স্বপ্ন। সময় এসেছে কথায় নয়, বাস্তব উন্নয়ন দিয়ে সুবর্ণচরের সড়কগুলোকে সত্যিকার অর্থে মানুষের চলাচলের উপযোগী করে তোলার।
আপনার মতামত লিখুন :