
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : এক সময় একই পতাকার নিচে আন্দোলন-সংগ্রামে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনীতি করেছিল বিএনপি ও জামায়াত। কিন্তু এখন সেই দুই পুরনো মিত্রই পরস্পরের মুখোমুখি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে তাদের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হুমকি, হামলা ও পাল্টা অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্থানীয় রাজনীতির মাঠ।
বিএনপি জামায়াতের জাতীয় জোট রাজনীতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মাঠ পর্যায়ে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। তারই সর্বশেষ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার দেওটি ইউনিয়নে জামায়াত কর্মীদের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকে হত্যার হুমকি ও মহিলা জামায়াতের প্রোগ্রামে হামলার অভিযোগ ঘিরে দুই দলের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
দেওটি ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রনিকে জামায়াত কর্মীরা হত্যার হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলা বিএনপির নেতারা।এই ঘটনার প্রতিবাদে দেওটি ইউনিয়ন বিএনপির উদ্যোগে সম্প্রতি এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক দিদার হোসেন দিদার, যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল আলমসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় নেতারা বলেন, জামায়াত এখন বিএনপির রাজনীতিতে অন্তর্ঘাত চালাচ্ছে। একসময় তারা আমাদের মিত্র ছিল, এখন প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে নেমেছে।
প্রতিবাদ সভার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে দেওটি বাজারে বিক্ষোভ মিছিল এবং শুক্রবার বিকেলে সোনাইমুড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আরও একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আরেকটি প্রতিভার সভা করেন সোনাইমুড়ি বাজার বিএনপি’র কেন্দ্রীয় অফিসে সন্ধ্যা ৭ স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগ এই প্রতিভা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে, গত ২৯ অক্টোবর বিকালে দেওটি ইউনিয়নের উত্তর দেওটি গ্রামে মহিলা জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত কোরআন তালিম প্রোগ্রামে বিএনপি কর্মীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে।দেওটি ইউনিয়ন মহিলা জামায়াতের সভানেত্রী ফাতেমা বেগম জানান, বিএনপির কতিপয় কর্মী অনুষ্ঠানস্থলে এসে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে এবং আমাদের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের চেষ্টা চালায়। আমরা সেদিনই থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।
পরদিন বৃহস্পতিবার বিকালে সোনাইমুড়ী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মহিলা জামায়াত এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায় এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।
সংবাদ সম্মেলনের পর উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে মহিলা জামায়াতের সদস্যদের উদ্দেশে কটূক্তি ও উসকানিমূলক পোস্ট দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই পোস্টগুলো স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং দুই দলের মধ্যে সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদ আলম বলেন, জামায়াতের এক কর্মী আমাদের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রনিকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশালীন ভাষায় গালাগাল করছে। আমরা থানায় অভিযোগ দিয়েছি।
তিনি দাবি করেন, জামায়াত এখন বিএনপির কর্মীদের টার্গেট করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর।
অপরদিকে উপজেলা জামায়াতের আমির হানিফ মোল্লা বলেন, বিএনপি কর্মীরা আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রোগ্রামে বাধা দিচ্ছে। তারা জামায়াতের উত্থান রুখতে মাঠে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।তিনি আরও বলেন, আমরা ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারের চেষ্টা করছি, কিন্তু বিএনপি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে, যা দুঃখজনক।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিএনপি জামায়াত জোটের ভাঙন ও পারস্পরিক অবিশ্বাস স্থানীয় রাজনীতিতে এখন বাস্তব রূপ নিচ্ছে। সোনাইমুড়ীর ঘটনাটি তারই প্রতিচ্ছবি।
তারা বলেন, দুই দলের নেতাকর্মীরা একসময় একসঙ্গে আন্দোলন করেছেন, কিন্তু এখন ভোটের মাঠ ও সংগঠন বিস্তারের লড়াই তাদের পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।
এক সময়ের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াত এখন সোনাইমুড়ীতে কার্যত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। স্থানীয় পর্যায়ে একের পর এক হামলা, হুমকি ও অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ তাদের সম্পর্কের ভাঙনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম বলেন, বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। আপাতত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে আছে যাতে কোনো পক্ষের উস্কানিতে সহিংসতা না ছড়ায়।
আপনার মতামত লিখুন :