প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

প্রশাসন চুপচাপ, হাতিয়ায় চলছে চর দখল

উপজেলা প্রতিনিধি, হাতিয়া :
মেঘনা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরগুলো এক সময় ছিল মহিষ ও গরুর অবাধ বিচরণভূমি। চারদিকে সবুজ ঘাস, কোথাও ভেড়ার পাল, কোথাও বাতানদের অস্থায়ী ঘর—সব মিলিয়ে এক স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব চরে বাতানরা তাদের গবাদিপশু লালন-পালন করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পরপরই একটি প্রভাবশালী মহল সংগঠিতভাবে চর দখলে নেমেছে।

মাটির স্তুপ তুলে জায়গা চিহ্নিত করা হচ্ছে, আর বাতানদের বসতঘিরে উচ্ছেদের চাপ বাড়ছে। অনেককে ইতোমধ্যে গরু-মহিষ সরিয়ে নিতে মৌখিক নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। হাতিয়া উপজেলার চর আতাউর ও জাগলার চরে দখলের এই চিত্র স্পষ্ট। তমরদ্দি ও চরকিং ইউনিয়নের পশ্চিমাংশে অবস্থিত চর দুটি বনবিভাগের আওতাভুক্ত হলেও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সীমিত জনবল দিয়ে দখল প্রতিরোধে হিমশিম খাচ্ছে বিভাগটি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ডের সহায়তা চেয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

সরেজমিনে চর আতাউর ঘুরে দেখা যায়, উত্তর পাশজুড়ে সারি সারি মাটির স্তুপ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি স্তুপে গাছের ডাল পুঁতে জমির দখল চিহ্ন বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকার বিনিময়ে এসব জমি মেপে প্রভাবশালীদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। বাতানদের ঘরের চারপাশেও একইভাবে স্তুপ বসানো হয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁশের বেড়া দিয়ে জমি আলাদা করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চরের উত্তর ও মধ্য অংশে বাতানরা অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন। দক্ষিণ অংশে রয়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও দুটি গুচ্ছগ্রাম, যেখানে প্রায় চার শতাধিক পরিবার বসবাস করে।

এলাকায় স্থায়ী কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী না থাকায় নদী পাড়ি দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে প্রশাসনকে আসতে হয়।
বনবিভাগ এখানে পুরোনো কেওড়া বাগান সংরক্ষণ ও নতুন জেগে ওঠা চরে বীজ বপনের কাজ করলেও দখলকারীরা ইতোমধ্যে বিশাল এলাকা দখলে নিয়ে স্তুপ তৈরি করেছে। দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে বনাঞ্চল ও চারণভূমি উভয়ই ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

মহিষের বাতান আবু তাহের জানান, গত বর্ষা মৌসুম থেকেই দখলের তৎপরতা শুরু হয়। বর্ষার মধ্যে তাদের ঘরের চারপাশ দখল করে জমি চাষ শুরু করা হয়। প্রতিবাদ করলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি। ফলে প্রায় হাজারের বেশি গরু-মহিষ খাদ্য সংকটে পড়ে। চারদিক চাষের জমিতে ঘেরা থাকায় পশুগুলো বের হতে না পেরে আটকা পড়ে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দখলকারীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয় এবং মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে পশু পালনের অনুমতি নিতে হয়।

এই সমঝোতায় চরকিং ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য ও কয়েকজন মহিষ মালিক উপস্থিত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আবু তাহের আরও বলেন, চলতি বছরের বর্ষার আগেই এসব জমি দখল করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চরবগুলা এলাকা থেকে লোকজন এসে জমি পরিমাপ করছে। অথচ চরটি এখনো বনবিভাগের মালিকানাধীন। দিনে-দুপুরে সরকারি জমি দখল হলেও প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। উত্তর দিক থেকে ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে দখল বিস্তৃত হচ্ছে। বাতানদের অভিযোগ, চর দখলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের বাড়ি পার্শ্ববর্তী চরকিং ইউনিয়নের চরবগুলা ও শুল্লুকিয়া গ্রামে। দখল কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে যুক্ত আছেন মাদু, শাহজাহান, জলিল, দুলাল, ফিরোজ ও ইরাক মাঝি। তারা দিনভর চরে অবস্থান করে রাতে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান।

রাজনৈতিকভাবে তারা আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য মনির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও চরে মনির উদ্দিনকে সরাসরি দেখা না গেলেও তীরবর্তী এলাকা থেকে দখল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে চরকিং ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, চর দখলের বিষয়ে তিনি অবগত। তার কাছে তথ্য এসেছে যে মনির মেম্বারসহ কয়েকজন এতে জড়িত থাকতে পারেন। তবে মনির উদ্দিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে কোনো পদে নেই। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানান ফখরুল।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মনির উদ্দিন বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাতিয়ার বাইরে অবস্থান করছেন এবং চর দখলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার নাম ব্যবহার করে কেউ এ ধরনের কাজ করলে সেটির দায়ভার তিনি নেবেন না। প্রশাসনকে প্রকৃত দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে চরে মহিষ পালনকারী মফিজ বাতান বলেন, গত এক দশকে কেউ কখনো চর দখলের চেষ্টা করেনি। সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন গ্রুপ এসে চর দখল শুরু করেছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে অচিরেই কেওড়া বন উজাড় হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আরেক মহিষ মালিক কামরু মিয়া জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই চরে গবাদিপশু পালন করছেন। জোয়ারের সময় পশু রক্ষায় মাটির কিল্লা ও পুকুর তৈরি করেছেন। কিন্তু হঠাৎ একটি পক্ষ তাদের এলাকা ছাড়তে চাপ দিচ্ছে। বিভিন্ন সময় মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। তিনি সরকারি উদ্যোগে চরটিকে স্থায়ী মহিষ চারণভূমি ঘোষণার দাবি জানান।

এ বিষয়ে নলচিরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আল আমিন গাজী বলেন, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে বনবিভাগের জমি দখলের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে চারজনকে আটক করে মামলা দেওয়া হয়েছে। তবে নদীবেষ্টিত দুর্গম এলাকা হওয়ায় নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন। সীমিত জনবলও বড় বাধা। সহযোগিতার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলউদ্দিন বলেন, মহিষ মালিকদের কাছ থেকে চর দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনবিভাগ থেকেও সহায়তা চাওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করে চরগুলো দখলমুক্ত করা হবে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর