
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করেই নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে শেষ হয়েছে খাল দখলমুক্ত অভিযান। উপজেলার ‘নৌকাঘাট’ খালটির নাওতলা মৌজার অংশ দখলমুক্ত হলেও সোনাইমুড়ী মৌজার অংশে প্রবেশ করতেই প্রায় ৩০ ফুট প্রশস্ত খালটি নালায় পরিনত হয়েছে। নানা জটিলতায় খালের উপরে নির্মিত স্থাপনা উচ্ছেদ না করেই দায়সারা ভাবে শেষ হয়েছে অভিযান কার্যক্রম। বর্তমানে খালের সামনের অংশে নতুন করে চলছে দোকান নির্মাণ আর পেছনে চলছে দখল।
গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা প্রত্যক্ষ করে নোয়াখালীবাসী। এরপর দখল-দূষণে মৃতপ্রায় খালগুলো দখলমুক্ত করা ছিলো জনগণের প্রাণের দাবি। জলাবদ্ধতা দূর করতে খালের উপর নির্মিত স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয় চলতি বছরের জুলাই থেকে। সোনাইমুড়ীতে অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আল জান্নাত। এসময় খালের উপরে দেওয়া অবৈধ বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। অভিযান চলাকালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে অনেক অবৈধ দখলদারদের নগদ অর্থ জরিমানা করা হয়। তবে উপজেলার নাওতলা মৌজার অংশের খাল দখলমুক্ত করে সোনাইমুড়ী মৌজায় ঢুকতেই যেন অভিযান গতি হারাতে থাকে। দখল-দূষণে পৌর শহরের বুকে নিশ্চিহ্ন হতে থাকা ‘নৌকাঘাট’ খালটির উদ্ধার কাজ শেষ না হতেই বন্ধ হয়ে যায় অভিযান। বর্তমানে খালের ওপরে আবারো তৈরী হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাইমুড়ী পৌর ভবনের উত্তর পাশ্বের হাইস্কুল রোড সংলগ্ন ‘নৌকাঘাট’ খালের ওপরে দোকানগুলো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। সেখানের ইউনিক থাই গ্লাস এন্ড এস.এস কর্ণার নামক দোকান থেকে শুরু করে সোনাইমুড়ী বাজারের সফিউল্যাহ ভূইয়া মার্কেট পর্যন্ত শতাধিক দোকান দখল করে রেখেছে খালটির সিংহ ভাগ।
পৌর ভবনের সামনের মাঠের বিপরীতে খালের পাশেই রয়েছে মাওলা ভবন সেখানে নতুন করে তৈরী করা হয়েছে কালভার্ট। তার পাশেই রয়েছে জামিয়া আশরাফিয়া দারুল মা’আরিফ মাদ্রাসা। অভিযানের কথা জানতে পেরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নিজেরাই খালের দখলকরা অংশের স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। তবে এখন নতুন করে খালের ওপরে তুলেছেন দুটি দোকান ও একটি কালভার্ট। এছাড়া মাদ্রাসার পর থেকে বাজার পর্যন্ত সড়ক সংলগ্ন দোকানগুলো খালের ওপরেই রয়েছে। দখলদারেরা দোকানের পেছনের অংশ থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনের যায়গা ছেড়ে দিয়েছে।
সোনাইমুড়ী মৌজার সিএস খতিয়ানে দেখা যায়, ৬৪ স্কেল ম্যাপের ১০৩১ দাগের হিসেবে কালাম মিয়ার হোটেল থেকে রেল লাইন পর্যন্ত সাড়ে ১১শো ফুট এবং আলিয়া মাদ্রাসার পশ্চিম দিক থেকে ৩০০ ফিট পর্যন্ত সরকারি খালের জমির ওপরে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। খতিয়ান অনুযায়ী হাইস্কুল রোড সহ খালের প্রশস্ত দেখানো হয়েছে ৮০ ফুট। যার মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসার অংশের খালের প্রশস্ত ৪৩ ফুট। পুরাতন উপজেলায় প্রবেশের গলি সংলগ্ন সড়ক থেকে খালের প্রশস্ত দেখানো হয়েছে ৭৮ ফুট। যার মধ্যে রাস্তা ৩৬ ফুট ও খাল রয়েছে ৪২ ফুট।
তবে খতিয়ান-ম্যাপ ও বাস্তবতা যেন ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে, কিন্তু গোয়ালে নেই’ অবস্থা। খালের ওপরে গড়ে তোলা অবৈধ পাকা স্থাপনা কবর রচনা করেছে একসময়ের গতিশীল ‘নৌকাঘাট’ খালের। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানকে কেন্দ্র করে স্থানীয়রা খাল দখল মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ম্যাপে থাকা প্রশস্ত খাল বাস্তবে নালায় পরিণত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানের অবৈধ দোকান-পাট উচ্ছেদ করেনি। তবে দোকানের পেছনের ৫ ফুটের মত যায়গা নিজেদের মত ছেড়ে দিয়েছে দখলকারীরা।
সোনাইমুড়ী পৌরসভার ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোঃ মাইন উদ্দিন জানান, রাস্তা সংলগ্ন খালের অংশ জেলা পরিষদের নামে রেকর্ড করা। নাওতলা দাগের দখলদারদের জেলা পরিষদের লিজের কাগজ না থাকায় অভিযানের আগেই নিজেদের স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে। সোনাইমুড়ী মৌজার খালের কিছু অংশ সোনাইমুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিজ নিয়ে দোকান তুলে ভাড়া দিয়েছেন। সোনাইমুড়ী মৌজার অংশের দখলকৃত খাল উচ্ছেদ করবে জেলা পরিষদ।
এবিষয়ে সোনাইমুড়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আল জান্নাত জানান, সোনাইমুড়ী মৌজার ওই অংশ জেলা পরিষদের জমি। এই অংশ উচ্ছেদের জন্য জেলা পরিষদকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে খাল থাকলেও যেভাবেই হোক বিএস জরিপে দোকান হিসেবে রেকর্ড আছে। আর পেছনে অল্প কিছু অংশ খাল হিসেবে রয়েছে। জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মেপে দিয়ে পেছনের অংশ ভেঙ্গে খালি করে দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। জেলা পরিষদ মেপে যতটুকু ভাংতে বলেছে ততটুকু ভাঙ্গা হয়েছে কিনা সেটুকু তদারকি করেছি। জমি যেহেতু জেলা পরিষদের সেহেতু বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। এছাড়া নতুুন করে খালের ওপরে কোন স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
আপনার মতামত লিখুন :