প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

নেতৃত্বের পরীক্ষায় বাংলাদেশ – মোহাম্মদ হানিফ

নেতৃত্বের পরীক্ষায় বাংলাদেশ – মোহাম্মদ হানিফ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে আয়োজিত ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনায় অংশ নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রত্যাবর্তন নিছক একটি আগমন নয় বরং এটি এক সন্ধিক্ষণ যেখানে দাঁড়িয়ে জাতি নতুন করে প্রশ্ন করছে, আমরা কেমন নেতৃত্ব চাই এবং কেমন রাষ্ট্র গড়তে চাই।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের দেশে ফেরা কেবল ব্যক্তি রাজনীতির ঘটনা নয়। এটি আগামীর বাংলাদেশে ক্ষমতা, দায়িত্ব, জবাবদিহি ও গণতন্ত্রের চরিত্র কী হবে সে প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দীর্ঘদিন নির্বাসন, মামলা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ভেতর দিয়ে যাওয়া একজন নেতার সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি নয়, বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে একটি গভীর বিশ্বাস রয়েছে সম্মান ও মর্যাদার চূড়ান্ত মালিক একমাত্র আল্লাহ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধৈর্য, বিনয় ও সহনশীলতাই নেতৃত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করে। বিপরীতে, অহংকার, দমননীতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভিত দুর্বল করে দেয়। আমাদের রাজনীতিতে এই সত্য বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির দৃষ্টান্তও একই কথা বলে। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবন্দি থাকার পর ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তিনি সত্য ও মীমাংসার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যের পথে নিয়েছিলেন। আবার প্রতিহিংসার রাজনীতি কীভাবে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে, তার উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বহু দেশে আজও দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের রাজনীতিতেও প্রতিহিংসার চক্র নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক শাসন, একদলীয় ব্যবস্থা, ক্ষমতার পালাবদল প্রতিটি পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের প্রবণতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে। সাম্প্রতিক অতীতে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মতপ্রকাশ দমনের অভিযোগ মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই স্মৃতি এখনো সমাজে দগদগে।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন অনেকের মনে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই আশা কোনো ব্যক্তিপূজা নয় এটি একটি গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের প্রত্যাশা। মানুষ চায়, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়া হোক।

এখানেই নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা। অপরাধের বিচার অবশ্যই হবে, কিন্তু তা হতে হবে আইনের মাধ্যমে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে। বিচার যদি প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তবে তা ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র দুটোরই পরিপন্থী।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, আইন যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাছে মানুষের প্রত্যাশা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, কিন্তু কোনো গোপন নির্যাতনকেন্দ্র, কোনো আয়নাঘর  কিংবা অদৃশ্য দমনযন্ত্র আর ফিরে আসবে না।
গতকাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা ছাড়া বিকল্প নেই। গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয় গণতন্ত্র মানে সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে রাখা।
এই জায়গায় তারেক রহমানের সামনে ইতিহাসে ভিন্নভাবে লেখা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি যদি প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে দায়িত্বের রাজনীতি বেছে নেন, ক্ষমতার বদলে জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে এই প্রত্যাবর্তন একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে।

একজন সাংবাদিকের পাশাপাশি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেই বলা যায় বাংলাদেশ আজ প্রতিশোধ নয়, পরিবর্তন চায়। ভয় নয়, আস্থা চায়। দমন নয়, ন্যায়বিচার চায়। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সেই পরিবর্তনের পথে একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ পায়। আমরা প্রত্যাশা করি, আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রা গণতান্ত্রিক পথে আরও সুদৃঢ় হবে। মহান আল্লাহ তা’আলার কাছে প্রার্থনা এই দেশ যেন এমন নেতৃত্ব পায়, যারা ক্ষমতার নয়, মানুষের কল্যাণের কথা ভাববে।

লেখক : দৈনিক নোয়াখালী কথা, স্টাফ রিপোর্টার

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর