প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিজয় উৎসব, জাতীয় সংগীত ও আমাদের ‘ভুবনজোড়া’ বাঙালিপনা – আব্দুল কাদের

ডিসেম্বর মাস এলেই বাঙালির রক্তে কেমন একটা ‘বিজয় বিজয়’ শিহরণ খেলে যায়। ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার বদলানো থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ে উচ্চশব্দে দেশাত্মবোধক গান—সব মিলিয়ে আমরা বুঝিয়ে দিই, আমরাই সেই বীরের জাতি। কিন্তু এই বাঙালিয়ানার শেকড়টা কোথায়? আমরা কেন নিজেদের বাঙালি বলি আর কেনই বা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে চিনে নিলাম, সেটা নিয়ে মাঝেমধ্যে চায়ের কাপে ঝড় তোলা প্রয়োজন।

ভূখণ্ড বনাম রাষ্ট্র: একাত্তর কি তবে কেবলই তারিখ?
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর আমাদের পরিচয় কি বদলে গেছে? আমরা কি তবে পূর্বের ইতিহাসকে অস্বীকার করছি? আরে না! ব্যাপারটা তো আসলে বাড়ির নাম পরিবর্তনের মতো। বাড়িটা তো আগেরই আছে, শুধু নেমপ্লেটে এখন সগর্বে লেখা—‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’।
বাংলাদেশ কেবল একটি স্রেফ ভূখণ্ড নয়, এটি একটি আবেগের নাম। তবে আমাদের প্রতিবেশী ভারত যখন এই বিজয়কে তাদের নিজেদের বিজয় বলে একটু বেশিই কৃতিত্ব নিতে চায়, তখন মনে হয়—রান্নাটা করল মা, আর প্রতিবেশী এসে বলছে, ‘লবণটা তো আমিই এগিয়ে দিয়েছিলাম, তাই ক্রেডিট আমার!’ সাহায্য তারা অবশ্যই করেছে, কিন্তু রক্তটা তো এ দেশের দামাল ছেলেদেরই ছিল।

জাতীয় সংগীত:

দেশভাগ রোধের গান যখন মিলনের সুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ নিয়ে আমাদের গবেষণার অন্ত নেই। মজার ব্যাপার হলো, গানটি লেখা হয়েছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রোধের আন্দোলনে, যাতে দুই বাংলা আলাদা না হয়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সেই গানটিই এখন আমাদের সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত।
রবীন্দ্রনাথের এই গানটি জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পাওয়ার পেছনে কোনো রহস্যময় ষড়যন্ত্র নেই, বরং আছে এক গভীর দর্শন। পাকিস্তানি শাসকরা যখন আমাদের ওপর উর্দু চাপিয়ে দিতে চাইল, তখন বাঙালি তার ‘সোনার বাংলা’র মায়ায় এমনভাবে মজেছিল যে, এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো পঙক্তি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটা অনেকটা সেই প্রেমের মতো—প্রেমিকা চলে গেলেও তার লিখে যাওয়া কবিতা যেমন হৃদয়ে গেঁথে থাকে, তেমনি অখণ্ড বাংলার হাহাকার আজ আমাদের সার্বভৌমত্বের গর্ব।

ভাষা ও অর্থনৈতিক মুক্তি:
হিন্দি বনাম বাংলা

অনেকে বলেন, বাংলা আর হিন্দির পার্থক্য তো শুধু সামান্য এদিক-সেদিক। কিন্তু এই ‘সামান্য’ পার্থক্যের জন্যই আমরা রক্ত দিয়েছি। পাকিস্তান ভেবেছিল, ধর্ম দিয়ে আমাদের পেট ভরিয়ে দেবে, আর ভাষা দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করে রাখবে। কিন্তু বাঙালি তো আর যে সে জাত নয়! আমরা বুঝলাম, পেটে ভাত না থাকলে আর মুখে নিজের ভাষা না থাকলে সেই স্বাধীনতার কোনো মানে নেই। অর্থনৈতিক মুক্তি আর সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা—এই দুই চাকার ওপর ভর করেই আমাদের একাত্তরের রথ চলেছে।
“আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি—এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
ডিসেম্বর মাস আমাদের জন্য কেবল উৎসবের নয়, আত্মোপলব্ধিরও। প্রতিবেশী দেশ কী দাবি করল বা রবীন্দ্রনাথ গানটি কোন প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন, তার চেয়ে বড় সত্য হলো—১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে আমরা একটা নতুন মানচিত্র এঁকেছিলাম। সেই মানচিত্রের কালি ছিল রক্ত, আর ভাষা ছিল বাংলা। তাই বাঙালিপনার এই উৎসব চলুক, তবে তাতে যেন কেবল পাঞ্জাবির চাকচিক্য নয়, ইতিহাসের স্বচ্ছতাও থাকে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কবি

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর