প্রকাশিত: ২ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২ জানুয়ারি, ২০২৬

নোয়াখালী-১ আসনে অভিজ্ঞ খোকনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
নির্বাচনী হাওয়ায় উত্তাল নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী আংশিক) সংসদীয় আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) এই আসনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট আটজন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। মনোনয়ন দাখিলকারীরা হলেন—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মনোনীত ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি মনোনীত মাওলানা মো. ছাইফ উল্যাহ, জাতীয় পার্টি মনোনীত মো. নূরুল আমিন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ মনোনীত মো. মশিউর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত মো. মমিনুল ইসলাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) মনোনীত রেহানা বেগম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ ইফতেখার উদ্দিন।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এ দাখিল করা প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি মনোনীত ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ছাড়া বাকি সাতজনই এবার প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। খোকন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অংশ নিলেও জয় পাননি।

শিক্ষাগত যোগ্যতায় সব প্রার্থীর মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল। হলফনামায় তার বিরুদ্ধে মোট ৪৬টি মামলার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলাই প্রত্যাহার হয়েছে, বেশ কয়েকটিতে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে এবং কয়েকটি মামলায় তিনি জামিনে আছেন। আইন পেশা ও বাড়ি ভাড়া থেকে তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ১৩ লাখ ৬ হাজার ১২৮ টাকা। স্থাবর সম্পত্তি দেখিয়েছেন ২ কোটি ৩২ লাখ ৯২ হাজার ৭০৪ টাকা, অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। দায় রয়েছে ৮৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯২ টাকা। চলতি অর্থবছরে তিনি আয়কর দিয়েছেন ১৫ লাখ ৯০ হাজার ১১১ টাকা। হলফনামায় স্বর্ণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা, যা ২০১৮ সালের হলফনামার সঙ্গে অপরিবর্তিত।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়লেও কর নিয়ে প্রশ্ন: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম আগে যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক ছিলেন। নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি গত ১২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। ৪৪ বছর বয়সী এই প্রার্থী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং গত বছর প্রবাসী আয় পাঠানোর স্বীকৃতিস্বরূপ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হিসেবে মনোনীত হন। তবে তার হলফনামায় দেওয়া আয় ও আয়কর সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি দেখা গেছে। তিনি দেশে ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৬১ টাকা এবং ব্যাংক সুদ বাবদ আয় ৯ হাজার ৮০৫ টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৬১৭ টাকা।

আয়কর আইন, ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের বাজেট অনুযায়ী ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ন্যূনতম আয়কর ৫ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও জহিরুল ইসলামের হলফনামায় ন্যূনতম কর প্রদানের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার আয়কর সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি ঢাকার আফতাবনগর এলাকার বাসিন্দা হিসেবে ট্যাক্স সার্কেল-৪০৬, ট্যাক্স জোন-১৯-এর অধীনে নিবন্ধিত করদাতা।

অন্যদিকে তিনি বিদেশ থেকে প্রতিবছর রেমিট্যান্স পাচ্ছেন ৫ কোটি ৩৩ লাখ ২৭ হাজার ৮১৬ টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি দেখিয়েছেন ৮ কোটি ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩১ টাকা এবং স্থাবর সম্পত্তি ৪ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ৯৯৩ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। জামায়াত, জাপা ও অন্যদের হলফনামা: জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী মো. ছাইফ উল্যাহ চাটখিল উপজেলার বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে থাকা ছয়টি মামলার মধ্যে তিনটিতে খালাস, দুটি প্রত্যাহার এবং একটি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। কামিল পাস এই শিক্ষকের বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭৪ টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং কৃষি ও অকৃষি জমিসহ স্থাবর সম্পত্তি ১ কোটি ২০ লাখ টাকা।

জাতীয় পার্টির প্রার্থী ৬২ বছর বয়সী মো. নূরুল আমিন আইন পেশায় নিয়োজিত। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলার তথ্য নেই। তার অস্থাবর সম্পত্তি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং স্থাবর সম্পত্তি ২ লাখ টাকা। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী মশিউর রহমান মাধ্যমিক পাস, পেশায় ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি ৪০ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭৩ টাকা এবং দুটি ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। নারী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী: এই আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী জেএসডির রেহানা বেগম। ৭০ বছর বয়সী এই প্রার্থী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। বাড়ি ভাড়া, ব্যবসা ও শেয়ার থেকে তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৯১৮ টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি ১ কোটি ৪৯ হাজার ৮০ টাকা এবং স্থাবর সম্পত্তি ২২ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী মো. মমিনুল ইসলাম ব্যবসা ও কৃষিকাজ থেকে বছরে আয় করেন ৯০ হাজার টাকা। তার অস্থাবর সম্পত্তি ২ লাখ টাকা এবং ২৪ শতক কৃষিজমি রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ ইফতেখার উদ্দিন স্নাতক ডিগ্রিধারী চাকরিজীবী। তার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে চেক ডিজঅনারের মামলা হলেও ২০২০ সালে সিআরপিসি ২৪৮ ধারায় তা প্রত্যাহার হয়। তার বার্ষিক আয় ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৩১৯ টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯২ টাকা এবং দায় রয়েছে ২৯ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৬ টাকা।

ভোটার ও নির্বাচনী প্রস্তুতি: চাটখিল উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭২২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৫৪ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২৬৮ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৪১টি। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৮৮ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে ৬২ জন জমা দিয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বাছাই চলবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। ২২ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর