
সেদিন ঢাকার আকাশ ছিল গুমোট, চারদিকে সেনা-সমর্থিত সরকারের রক্তচক্ষু। ২০০৭ সালের সেই উত্তাল ওয়ান-ইলেভেনের বিকেলে রাজনীতির মঞ্চে যখন বড় বড় নামগুলো নিজেদের নিরাপদ রাখার ফন্দি খুঁজছিল, ঠিক তখনই এক শান্ত অথচ অটল কণ্ঠস্বর পুরো জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দিয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া উচ্চারণ করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক পঙক্তি বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। আজ যখন তাঁর সেই কণ্ঠ চিরতরে নীরব হয়ে গেছে, তখন সেই বাক্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের এক অনানুষ্ঠানিক দলিলে পরিণত হয়েছে। মানুষের চোখের অবাধ্য নোনাজল আর হৃদয়ের গহীন কোণে জমা হওয়া নিভৃত শোক আজ প্রমাণ করছে ঠিকানা বলতে তিনি কেবল ইটের দেয়াল বোঝেননি, তিনি বুঝেছিলেন এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মানচিত্রকে।
ইতিহাস সাক্ষী, রাজনীতির এই কঠিন পথটি তিনি স্বেচ্ছায় বেছে নেননি। এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে পরিস্থিতির চাপে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একবার যখন দাঁড়িয়েছেন, তখন হিমালয়ের মতো অনড় থেকেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সেই কুশীলবরা তাঁকে সপরিবারে নির্বাসনে পাঠানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। পর্দার আড়ালে প্রস্তাব ছিল বিদেশে রাজকীয় জীবন, উন্নত চিকিৎসা আর দুই সন্তানের মুক্তি। যে কোনো সাধারণ মানুষ হয়তো সেই প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করত। কিন্তু তিনি ছিলেন এক অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ।
তিনি জানতেন, এই মাটির টান ছিন্ন করে বিদেশে গিয়ে রাজার হালে থাকার চেয়ে স্বদেশের কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মরা অনেক বেশি সম্মানের। তিনি সেদিন বিদেশের বিলাসিতাকে সপাটে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর সেই জেদ ছিল আসলে ক্ষমতার প্রতি নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক অলঙ্ঘনীয় আনুগত্য। তিনি শিখিয়েছেন, নেতার আসল শক্তি বিদেশের কোনো ড্রয়িংরুমে নয়, বরং দেশের মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।
‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার সেই ভয়াল দিনে যখন একে একে সব বাঘা বাঘা নেতা ‘আপস’ বা ‘পলায়ন’ এই দুটি রাস্তার একটি বেছে নিচ্ছিলেন, তখন বেগম জিয়া একাই হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠকে তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন হাসিমুখে। কারণ তাঁর মনে এই ধ্রুব সত্যটি গেঁথে ছিল যে, যে নেতার পা বিদেশের মাটিতে পড়ে, সে নেতার আর দেশের মানুষের ওপর অধিকার থাকে না।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে দেখা যায় অনেক নেতা ক্ষমতা হারানো মাত্রই পাসপোর্ট বদলে ফেলেন, বিদেশের মাটিতে সেকেন্ড হোম তৈরি করেন, তখন বেগম খালেদা জিয়ার সেই অবিনশ্বর স্মৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় দেশপ্রেম কেবল বক্তৃতার মঞ্চে নয়, দেশপ্রেম থাকে ত্যাগের গভীরতায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের বাইরে তাঁর কোনো মানচিত্র নেই, কোনো ঠিকানা নেই।
একজন মা হিসেবে তাঁর ত্যাগ ছিল অকল্পনীয়। তাঁর চোখের সামনে তাঁর আদরের সন্তানদের ওপর জুলুম চালানো হয়েছে। মা হিসেবে তাঁর বুক হয়তো ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু নেত্রী হিসেবে তিনি এক ইঞ্চিও পিছু হটেননি। নিজের ছেলেদের জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি দেশের মানুষের সাথে বেইমানি করেননি। এটি কেবল রাজনীতির কৌশল ছিল না, এটি ছিল এক চরম আত্মবলিদান।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, কেন তিনি শেষ সময়েও বিদেশে চিকিৎসার জন্য জেদ ধরলেন না? কেন তিনি বিদেশের কোনো উন্নত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের চিন্তা করলেন না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর সেই পুরনো উচ্চারণে। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর শেষ নিশ্বাসটি যেন এই বাংলাদেশের ধূলিকণা স্পর্শ করে। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জানাজায় যেন এই দেশের মেহনতি মানুষের কান্নার শব্দ মিশে থাকে। আজ ঢাকার রাজপথে যে মানুষের ঢল, যে বুকফাটা হাহাকার, এটাই হলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। তিনি ক্ষমতার মায়া ত্যাগ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু এই দেশের নোনাজলের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। তাঁর এই আপসহীন অবস্থানই এই দর্শনকে জীবন্ত করে রেখেছে। তিনি বুঝিয়েছিলেন, এই দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রেসক্রিপশন কোনো বিদেশি প্রভুর দরবার থেকে আসবে না, আসবে এই দেশের মানুষের মাটি থেকে। তাঁর সাদা শাড়ির আড়ালে যে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা ছিল, তা দেখে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোও থমকে দাঁড়াত। তিনি মাথা নোয়াতে শেখেননি বলেই হয়তো তাঁকে জীবনের দীর্ঘ সময় অবর্ণনীয় কষ্টে কাটাতে হয়েছে, কিন্তু সেই কষ্টই তাঁকে আজ ইতিহাসের অমরত্বের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। মানুষের হৃদয়ে এক অক্ষয় ঠিকানা।
আজকের এই বিষণ্ণ ক্ষণে পুরো বাংলাদেশ যেন এক থমথমে নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। মানুষের চোখের কোণে জমে থাকা পানি আজ কোনো দলের বা মতের নয়; এই পানি এক হারানো অভিভাবকের প্রতি ভালোবাসার। বেগম জিয়া কোনো বিপুল ধন-সম্পদ রেখে যাননি, কোনো বিদেশি রাজপ্রাসাদ তাঁর নেই। তাঁর সম্পদ হলো এই দেশের কয়েক কোটি মানুষের অবিরাম ভালোবাসা।
তিনি যখন কারান্তরালে ধুঁকেছিলেন, যখন একা একাকী অসুস্থতার সাথে লড়াই করছিলেন, তখনো তিনি বিদেশের কোনো আরামদায়ক হাসপাতালের বিছানা কামনা করেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের সেই পিজি হাসপাতালের চার দেয়ালকে। তাঁর এই অনমনীয় চরিত্র আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল শিক্ষা। আজ যখন মেধা পাচার হচ্ছে, মানুষ সামান্য সুযোগে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, তখন খালেদা জিয়ার সেই তেজস্বী বাণী এক পশলা বৃষ্টির মতো আমাদের মনে আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু নীতি ও আদর্শ চিরস্থায়ী। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে, মাটির মানুষ মাটির কাছেই ফিরে আসে। তিনি কোনো আভিজাত্যের মোহে নিজের শেকড়কে ভুলে যাননি। আজ তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর রেখে যাওয়া সেই উচ্চারণ— বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই আগামী একশ বছর ধরে এই দেশের প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ে সাহস জোগাবে।
বিদায় হে আপসহীন নেত্রী। আপনি আপনার ঠিকানাতেই ফিরে গেছেন। এই বাংলাদেশের ধূলিকণা, এই নদী, এই শ্যামল প্রকৃতি আর কোটি মানুষের হৃদপিণ্ডের ভেতরেই আপনার প্রকৃত ভালোবাসা । আপনি ঘুমান পরম শান্তিতে, আপনার ত্যাগ আর ভালোবাসা এই মানচিত্রের প্রতিটি ভাঁজে মিশে থাকবে আজীবন। ইতিহাসের পাতায় আপনি থাকবেন সেই একগুঁয়ে দেশপ্রেমিক হিসেবে, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়েও দেশের মাটিকে ছোট হতে দেননি।
হে মাটির কন্যা, আপনার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। আপনি বীরের মতো বেঁচে ছিলেন, বীরের মতোই চিরবিদায় নিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে কেবল একজন নেত্রী হিসেবে নয়, বরং এই ভূখণ্ডের চিরস্থায়ী অভিভাবক হিসেবে।মহান আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করছি আল্লাহ তা’আলা আপনাকে যেন জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন আমিন
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার , দৈনিক নোয়াখালীর কথা
আপনার মতামত লিখুন :