প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

সোনাইমুড়ীর নৌকাঘাট খাল : লিজের ফাঁদে পজিশন বাণিজ্যের রমরমা

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
এক সময় যে খাল দিয়ে পণ্যবাহী বড় বড় নৌকা চলত, আজ সেখানে সারি সারি দালান ইটের দেয়াল আর নিরেট কংক্রিটের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। খাতা-কলমে যে জায়গাটি খালের পাড়, বাস্তবে তা এখন পজিশন বিক্রির এক বিশাল হাট। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী পৌরসভার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নৌকাঘাট খালটির অস্তিত্ব এখন কেবল জেলা পরিষদের ধুলো জমা নথিতেই সীমাবদ্ধ। কাগজে-কলমে ছাত্রাবাস কিংবা শিক্ষক নিবাস গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জেলা পরিষদ থেকে লিজ নেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আলিশান বাণিজ্যিক দোকান। ইজারার শর্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খালের জমি হাতবদল হচ্ছে লাখ লাখ টাকায়, অথচ দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই অনিয়মের মহোৎসবে চোখ বন্ধ করে আছে তদারকি প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনাইমুড়ী বাজারের প্রধান পানি নিষ্কাশন মাধ্যম এই নৌকাঘাট খালের মৃত্যুঘণ্টা বেজেছিল ২০০৪ সালে। ওই বছরের ১০ জানুয়ারি সোনাইমুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ছাত্রাবাস, শিক্ষার্থী মিলনায়তন ও শিক্ষক নিবাস নির্মাণের অযুহাতে খালের ভেতরে জমি বরাদ্দের আবেদন করেন। তৎকালীন সংসদ সদস্যের সুপারিশে জেলা পরিষদ ৩১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৬ ফুট প্রস্থের (প্রায় ৪ হাজার ৯৬০ বর্গফুট) খালের পাড় একসনা (এক বছর মেয়াদি) বন্দোবস্ত দেয়।

শর্ত ছিল পাকা স্থাপনা করা যাবে না এবং পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষক কিংবা ছাত্রদের থাকার ঘরের বদলে সেখানে নির্মিত হয়েছে ২৯টি স্থায়ী বাণিজ্যিক দোকান। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্কুল কর্তৃপক্ষ এসব দোকান বরাদ্দ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক টাকা। প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ২ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, লিজ নেওয়া এই সরকারি জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের কাছে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি বা সাব-লিজ দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্যও মিলেছে।

শুধু স্কুল কর্তৃপক্ষই নয়, হাইস্কুল রোড সংলগ্ন টেস্টি ট্রিটের গলি থেকে শুরু করে আলিয়া মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার বর্গফুট খালের ওপর এখন অন্তত ৬৫টি পাকা দোকান। জেলা পরিষদ থেকে মাত্র ১৫ টাকা বর্গফুট দরে একসনা লিজ নিয়ে ইজারাদাররা এখানে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য ফেঁদেছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে কয়েক হাত বদলের চিত্র। সততা মেডিকেল হল’এর মালিক রাকিবুল ইসলাম জানান, তিনি ১০ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে দোকান চালাচ্ছেন। মা লাইব্রেরি’র স্বত্বাধিকারী সাখাওয়াত হোসেন গত ১০ বছর ধরে ব্যবসা করছেন ৪ লাখ টাকা সেলামি ও ৯ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায়। একইভাবে ইশরাত মেডিকেল হল’ হাতবদল হয়েছে ৫ লাখ টাকায়। খালের ওপর নির্মিত এসব দোকানের পজিশন কেনাবেচা নিয়ে সোনাইমুড়ী বাজারে এখন ওপেন সিক্রেট বাণিজ্য চলছে।

নথিপত্রে শ্রেণি পরিবর্তন ও আইনি মারপ্যাঁচ দখলকে স্থায়ী রূপ দিতে প্রভাবশালীরা বেছে নিয়েছে জালিয়াতির পথ। খালের জমিকে নথিপত্রে ভিটা বা দোকান’ হিসেবে পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদ স্বীকার করেছেন, প্রাকৃতিকভাবে নয়, বরং জালিয়াতির মাধ্যমে খালের শ্রেণিকে পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে উচ্ছেদ অভিযানে আইনি জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই শ্রেণি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জেলা পরিষদ ইতোমধ্যে ৩২টি মামলা করেছে, আরও অনেক মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে পরিষদের সার্ভেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইমরান হোসেন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তার চোখের সামনে খালের বুক চিরে একের পর এক পাকা ভবন উঠলেও তিনি ছিলেন অন্ধ। প্রতিবেদকের প্রশ্নের মুখে প্রথমে ‘কিছুই জানি না বলে এড়িয়ে গেলেও পরে অনিয়মের কথা স্বীকার করেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশ ছাড়া খালের ওপর এমন স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা অসম্ভব।

সোনাইমুড়ীর সচেতন মহলের প্রশ্ন অনিয়ম, দুর্নীতি আর আইনি মারপ্যাঁচে কি এভাবেই বিলীন হয়ে যাবে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো? নাকি দখলদারদের উচ্ছেদ করে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে নৌকাঘাট খাল?

সোনাইমুড়ী পৌরসভার পানি নিষ্কাশনের প্রধান ধমনি এই নৌকাঘাট খাল। গত বছরের ভয়াবহ বন্যায় সোনাইমুড়ীবাসী হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হওয়ার কুফল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, যেভাবে খালের ওপর ভবন তুলে বাণিজ্য চলছে, তাতে আগামী বর্ষায় পুরো পৌরসভা এক নরককুণ্ডে পরিণত হবে। খালের পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সব রাস্তা।

জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদ জানান, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সকল ইজারার মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং কোনো নবায়ন করা হয়নি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল উচ্ছেদ করার, কিন্তু শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তি হলেই দখলদারদের থাবা থেকে খালটি মুক্ত করা হবে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর