প্রকাশিত: ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কাগজে ১৪০ কোটি, মাঠে গণভোটের ছায়াও নেই!

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার:

সোনাইমুড়ী পৌরসভার শিমুলিয়া নোয়াবাড়ী এলাকা। ৬০ বছর বয়সী নুরুন নাহার বেগম বসে আছেন উঠানে। সরল চোখে বললেন, আমি কোনোদিন বাজারও যাই নাই। জামাই বেগুন বেচে খায়। শুনছি ভোট হবে—হাতপাখা, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা মার্কা। কিন্তু গণভোট কী জিনিস, জুলাই জাতীয় সনদ কী এসব আমি বুঝি না।

একজন গ্রামীণ নারীর এই কথায় ধরা পড়েছে নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী) আসনের হাজার হাজার ভোটারের বাস্তব চিত্র। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ (সংবিধান সংস্কার) বিষয়ক গণভোট নিয়ে জনমনে ঘন অস্পষ্টতা। সরকারি দপ্তরগুলো দাবি করছে শত কোটি টাকা খরচ করে প্রচার চলছে কিন্তু মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-ইউনিয়নে প্রচারের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ছে না। সাধারণ মানুষ জানেই না এ ভোট কেন দিতে হবে, কীভাবে দিতে হবে, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিলে কী হবে।
সরেজমিনে নদনা ইউনিয়নের আতর মিয়া মিজি বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল ১৫টি পরিবারে প্রায় ৩০ জন ভোটার। কেউই সাধারণ নির্বাচন আর গণভোটের পার্থক্য বুঝতে পারছেন না। নারী, কৃষক, দিনমজুর, তরুণ—সবার মুখে একই কথা। এ আসনে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। অথচ তাদের একটা বড় অংশ এ প্রক্রিয়া নিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এক তরুণ বললেন, “ফেসবুকে কিছু দেখি, কিন্তু গণভোট কী বুঝি না। প্রচার তো কোথাও দেখি নাই।

নির্বাচন কমিশনের বাজেট শাখার তথ্য অনুযায়ী, গণভোট প্রচারে ছয়টি মন্ত্রণালয় মিলে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে।এলজিইডি: ৭২ কোটি টাকা  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়: ৪৬ কোটি টাকা  ধর্ম মন্ত্রণালয়: ৭ কোটি টাকা  তথ্য মন্ত্রণালয়: ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা   সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়: প্রায় ৪.৫২ কোটি টাকা  মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়: প্রায় ৪.৩৪ কোটি টাকা
কিন্তু সোনাইমুড়ী উপজেলায় এই টাকার কোনো প্রভাব নেই। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কোনো অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক প্রচার চোখে পড়েনি। মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও সমাজসেবা কর্মকর্তারা জানালেন, প্রচারের জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দই পাননি। যা হচ্ছে, তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে। সবচেয়ে বড় বরাদ্দ পাওয়া এলজিইডি বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো দৃশ্যমান কাজ ব্যানার, মাইকিং, সভা উপজেলা জুড়ে নেই।

প্রচারের এ স্থবিরতার পেছনে নির্বাচন কমিশনের একটি চিঠির প্রভাব স্পষ্ট। গত ২৯ জানুয়ারি আসা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তারা জনগণকে সচেতন করতে পারবেন, কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনো পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। নাম প্রকাশ না করে এক কর্মকর্তা বললেন, এ নির্দেশের পর আইনি জটিলতার ভয়ে অনেকে প্রচার বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে মাঠে কাজ থেমে গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নাছরিন আকতার বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে সভা-সেমিনার ও ব্যানার টানানোর কাজ চলছে। প্রান্তিক মানুষের অজ্ঞতা নিয়ে হয়তো আপনাদের স্যাম্পলের সাথে আমাদের কার্যক্রম মিলছে না, কিন্তু কাজ চলমান আছে।

কিন্তু সচেতন মহলের প্রশ্ন‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধানের সংস্কার প্রস্তাব (যেমন: নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, ক্ষমতার ভারসাম্য) যদি ভোটাররাই না জানেন, তাহলে জনগণের ট্যাক্সের ১৪০ কোটি টাকা খরচ করে এ গণভোট কতটা অর্থবহ হবে? প্রচারের এ ‘মহোৎসব’ যদি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

গণভোটের মূল উদ্দেশ্য যদি জনমত নেওয়া হয়, তাহলে প্রান্তিক ভোটারদের অজ্ঞতা দূর করা কি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নয়? না হলে এ টাকা খরচ কার স্বার্থে? সোনাইমুড়ী-চাটখিলের মতো গ্রামীণ এলাকায় এ প্রশ্ন এখন উঠছে জোরালোভাবে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর