প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৫ এপ্রিল, ২০২৬

পদোন্নতি বঞ্চিত ও বিশেষ ভারপ্রাপ্তদের ভারে প্রশাসন -ফিরোজ আলম মিলন

রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো একটি দেশের উন্নয়ন, সুশাসন ও নাগরিক সেবার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চনা এবং বিপুল সংখ্যক বিশেষ ভারপ্রাপ্ত (ওএসডি) কর্মকর্তার উপস্থিতি প্রশাসনে এক ধরনের স্থবিরতা ও অদক্ষতার জন্ম দিচ্ছে—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু কর্মকর্তাদের মনোবলই নষ্ট করছে না, বরং প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি ও মানকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে এমন বহু কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। নির্ধারিত সময় পার হলেও নানা অজুহাতে তাদের পদোন্নতি আটকে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, কিছু কর্মকর্তাকে হঠাৎ করেই বিশেষ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বহীন অবস্থায় রাখা হচ্ছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য অস্বাভাবিক ও অস্বাস্থ্যকর একটি চিত্র তৈরি করছে।

পদোন্নতি বঞ্চনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা প্রভাবের কারণে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন এবং তাদের কর্মস্পৃহা কমে যাচ্ছে। প্রশাসনের ভেতরে এই অসন্তোষ ধীরে ধীরে একটি বড় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।

বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওএসডি) সংখ্যা বৃদ্ধিও আরেকটি উদ্বেগজনক দিক। ওএসডি হিসেবে থাকা মানে কার্যত কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্ব না থাকা। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ জনবল নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যেখানে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, সেখানে এই কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না—এটি একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একাধিক প্রশাসনিক সূত্র জানায়, অনেক সময় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রথা প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং তারা স্বাধীনভাবে কাজ করার সাহস হারিয়ে ফেলেন। ফলস্বরূপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, দায়িত্ব এড়িয়ে চলা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করা জরুরি। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসনের ভেতরে বিভাজন ও অসন্তোষ বাড়তেই থাকবে। একইসঙ্গে ওএসডি প্রথা সীমিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তাদের কার্যকর দায়িত্বে নিয়োজিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে নিয়মিত পদোন্নতি বোর্ডের সভা আয়োজন, কর্মমূল্যায়নের স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এছাড়া, দীর্ঘদিন ওএসডি হিসেবে থাকা কর্মকর্তাদের দ্রুত পুনর্বহাল করে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ প্রশাসন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পদোন্নতি বঞ্চনা ও বিশেষ ভারপ্রাপ্তদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রশাসনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। প্রশাসনকে গতিশীল ও কার্যকর রাখতে হলে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং ওএসডি প্রথার যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই পারে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান এনে দিতে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সদিচ্ছা এবং বাস্তবমুখী উদ্যোগই পারে প্রশাসনের এই অচলাবস্থা দূর করে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে।

পরিশেষে বলা চলে যারা পদোন্নতি বঞ্চিত হয় তারাই বুঝে এর যাতনা। পুরনো সেই ভাবধারাটি উল্লেখ করতে হয়” কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে , কভু আশীবিষে দংশেনি যারে”। যারা একবার বা একাধিকবার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছে তারাই বুঝে এর প্রকৃত যন্ত্রণাটা কতটুকু। এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সততা, দক্ষতা, যোগ্যতার পাশাপাশি কর্মক্ষম থাকলে এবং অতিরিক্ত রাজনৈতিক উচ্চাবিলাসী না হলে ওএসডি বা অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদোন্নতি বঞ্চিত করার আদি প্রথা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করে সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পরিহার করে সেবাধর্মী মনোভাব গড়ে উঠবে প্রশাসনে। তবেই জার্সি বদলের প্রচলন রুদ্ধ হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর