
নুশরাত রুমু, সদর : আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন কামারপাড়ায় এখন শোনা যায় হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। আগুনের লেলিহান শিখা, হাপরের গর্জন আর লোহা পেটানোর ছন্দে মুখর হয়ে উঠেছে মাইজদী, সোনাপুর ও দত্তের হাটের কামারপাড়াগুলো। ঈদে পশু কোরবানির কাজে ব্যবহৃত দা, ছুরি ও বটির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কামার শিল্পের কারিগররা।
সারা বছর কাজের মন্দাভাব থাকলেও ঈদ এলেই কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় এই পেশা। কেউ নতুন দা-বটি তৈরি করছেন, আবার কেউ পুরোনো সরঞ্জামে শান দিচ্ছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের তাপে ঘাম ঝরিয়ে চলছে তাদের নিরবচ্ছিন্ন শ্রম।
কারিগররা জানান, আকার ও মানভেদে একটি দা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়। ছুরি ও চাকুর দাম ৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে লোহা, কয়লা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে। অনেক সময় ধার করে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে গিয়ে মাইজদী জজকোর্ট মোড়ে কথা হয় সোহেল নামের এক দা- বটি বিক্রেতার সাথে। প্রায় ১৪ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত তিনি। জানান, বর্তমানে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার বিক্রি হলেও আগের মতো লাভ নেই। খরচ বাড়লেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় তেমন সুবিধা করতে পারছেন না।
কাউয়া রোডের কামার বিপুল কর্মকার বলেন, আগে হাতে তৈরি সরঞ্জামের চাহিদা বেশি ছিল। এখন অনেকেই বাজারের তৈরি পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে আগের মতো কাজও নেই।
দত্তের হাটের তরুণ কামার নীরব কর্মকার জানান, বাবা-দাদার পেশা ধরে রাখলেও এই কাজ করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই আক্ষেপ বিজয় কর্মকারের কণ্ঠেও। তিন পুরুষের পেশা ছাড়তে না পারলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ কাজে আনতে চান না তিনি।
প্রায় ৩০ বছর ধরে কামারের কাজ করছেন নিহার কর্মকার। তিনি বলেন, ধার করে কাঁচামাল কিনলেও বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না।
অন্যদিকে বলরাম কর্মকারের ভাষায়, “যত দিন বাঁচব, এই কাজ করেই যাব। তবে সন্তানদের অন্য কাজ শেখাতে চাই। কারণ সরকারি কোনো সহযোগিতা নেই এই শিল্পে।”
স্থানীয়দের মতে, একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি হাট-বাজারে কামারদের ব্যাপক কদর ছিল। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কারখানায় তৈরি পণ্যের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা। নতুন প্রজন্মও আগ্রহ হারাচ্ছে ধীরে ধীরে।
কামার শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। নয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে গ্রামীণ বাংলার পুরোনো এই ঐতিহ্য।
আপনার মতামত লিখুন :