
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, মেঘনার উত্তাল ঢেউ এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জনজীবন। অবিরাম বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি এবং নিচু এলাকার অসংখ্য বসতঘর। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজ নেই, আয় নেই—ফলে শত শত পরিবারের চুলায় দুই-তিন দিন ধরেও আগুন জ্বলছে না।
দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে অনেক কাঁচা ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। রান্নাঘর তলিয়ে যাওয়ায় মাটির চুলায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের সংকটে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের ঢলে নিম্নাঞ্চল একাকার হয়ে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বুড়িরচর এলাকার দিনমজুর রফিক মিয়া (৪৫) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বৃষ্টির পানিতে ঘর ডুইবা গেছে। এক সপ্তাহ ধইরা কোনো কাম নাই। ঘরে চাল নাই, পোলাপান না খাওয়ার মতো আছে। পানি কমলেও যদি কাজ না পাই, তাইলে না খাইয়াই মরতে অইবো।মুছা মিয়ার এই আর্তনাদ যেন পুরো হাতিয়ার হাজারো শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব চিত্র। রিকশাচালক, দিনমজুর, ট্রলার শ্রমিক, মাছঘাটের কুলি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার—সবাই কর্মহীন হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন।
নলচিরা ঘাটের শ্রমিক রতন বলেন, “ঘাটে এখন মানুষজনই আসে না। লঞ্চ-ট্রলার চলাচলও অনেক কমে গেছে। সারাদিন বসে থাকলেও কোনো কাজ মেলে না। পরিবার চালানো খুব কষ্ট হয়ে গেছে। এখন সরকারি সহায়তা ছাড়া আমাদের বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।
খাশের হাটের সবজি ব্যবসায়ী আবুল খায়ের বলেন, “বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেকে বাজারে ক্রেতা অনেক কমে গেছে। বাইরে থেকে সবজি আনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যা মাল আছে, তারও বিক্রি হচ্ছে না। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। সংসার চালানোই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
উপজেলার তমরুদ্দি, বুড়িরচর, সোনাদিয়া, চর ঈশ্বর, নলচিরা, সুখচর, চরকিং ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে রয়েছে। অনেক কৃষকের জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় আমন ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন গ্রামের কাঁচা সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনেও অনেক মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
অন্যদিকে, টানা বৃষ্টির কারণে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে দূষিত পানি ব্যবহার করছেন। এতে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, “উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেখানে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং জরুরি ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের দাবি, দুর্যোগ দীর্ঘায়িত হলে দ্বীপাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাই দ্রুত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় পানি, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কর্মহীন পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
দুর্যোগের এই সময়ে হাতিয়ার হাজারো পরিবার এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছে। আকাশের কালো মেঘ একসময় হয়তো কেটে যাবে, পানি নেমেও যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের কর্মহীনতা, খাদ্যসংকট ও জলাবদ্ধতা যে ক্ষত প্রান্তিক মানুষের জীবনে তৈরি করেছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দ্বীপের অসহায় মানুষের একটাই প্রত্যাশা—দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ তাদের পাশে দাঁড়াবে, যাতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম কিছুটা হলেও সহজ হয়।
প্রকাশের আগে প্রতিবেদনের সব তথ্য, উদ্ধৃতি ও ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো। এতে প্রতিবেদনটি আরও নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
আপনার মতামত লিখুন :