প্রকাশিত: ৩ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৩ আগস্ট, ২০২৬

সাড়ে চার কোটি টাকার ফেরি রোড নদীভাঙনে বিলীনের পথে

উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-যোগাযোগ কেন্দ্র নলচিরা ঘাট তীব্র নদীভাঙনের মুখে পড়েছে। কয়েক মাস আগে নির্মিত প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ের পল্টন-জেটি, লো-ওয়াটার ও মিড-ওয়াটার ফেরি রোডসহ ঘাটের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। প্রতিদিনই নদীর খরস্রোত ও জোয়ারের তোড়ে ভাঙছে ঘাটসংলগ্ন এলাকা। এতে যাত্রী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপানোর কারণে সময় পার হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন নলচিরা ঘাটে ব্যাংক প্রটেকশনসহ মিড-ওয়াটার ফেরি ঘাট নির্মাণে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, লো-ওয়াটার ফেরি ঘাট নির্মাণে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং জেটি ও স্পাড নির্মাণে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নদীভাঙনের তীব্রতায় ওই অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কোটি কোটি টাকার এই সরকারি বিনিয়োগ অচিরেই নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাটসংলগ্ন এলাকায় নদীর পাড়ের বড় অংশ ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। বিভিন্ন স্থানে মাটি ধসে পড়ছে, ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ফেরি রোড, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের হাট বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এতে ঘাট ব্যবহারকারী যাত্রী ও যানবাহনের চলাচলেও প্রতিনিয়ত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা হক সাব (ডাক্তার) বলেন, “চোখের সামনে আমাদের ঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। প্রতি বছর শুধু আশ্বাস শুনি, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর কাজ দেখি না। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই পুরো ঘাট বিলীন হয়ে যাবে।”

নিয়মিত যাত্রী আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন, “প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ঘাট ব্যবহার করতে হয়। জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ঘাট নির্মাণ করলেও সেটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুরো বিনিয়োগই এখন হুমকির মুখে।

ঘাটের ইজারাদার আফজাল হোসেন রাবু বলেন, নদীভাঙনের কারণে ঘাটের মূল অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে যাত্রী ও যানবাহন ওঠানামা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে আমরা ঘাট ইজারা নিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছি। দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে ঘাটটি অচল হয়ে পড়বে এবং এই অঞ্চলের নৌ-যোগাযোগে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিসাদ আহমেদ বলেন, ঘাটের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কাজ আমরা সম্পন্ন করেছি। তবে নদীতীর সংরক্ষণ ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা পাউবোকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। একই সঙ্গে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জানান, হাতিয়া অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। নলচিরা ও চেয়ারম্যানঘাটসহ নদীভাঙনপ্রবণ স্থানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে দুটি প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল আহমেদ বলেন, “নলচিরা ঘাট রক্ষায় একটি টেকসই গাইড বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা হবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।”

স্থানীয়দের দাবি, এসব আশ্বাস দীর্ঘদিন ধরেই শুনে আসছেন তারা। কিন্তু বাস্তবে এখনো জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা কিংবা নদীভাঙন ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে শুধু নলচিরা ঘাট নয়, কয়েক কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-যোগাযোগও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

এ অবস্থায় নলচিরা ঘাট রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও ঘাট বহারকারীরা।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর