প্রকাশিত: ৫ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৫ আগস্ট, ২০২৬

দুর্ঘটনাই আশীর্বাদ! চাঁদে স্পেসএক্সের রকেটের আঘাতে নতুন গবেষণার সুযোগ

মার্কিন মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের একটি পরিত্যক্ত রকেটের অংশ চাঁদের বুকে আছড়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সংঘর্ষে চাঁদের বিখ্যাত আইনস্টাইন ক্রেটার-এর কাছাকাছি একটি নতুন গর্ত (ক্রেটার) সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ঘটনাটি শুধু একটি মহাকাশ দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি চাঁদ সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার এক বিরল গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযান ও সেখানে মানব বসতি স্থাপনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রকেটটির আঘাতে চাঁদের ভূপৃষ্ঠে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, কত দূর পর্যন্ত ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়েছে এবং চাঁদের অভ্যন্তরে কী ধরনের কম্পন সৃষ্টি হয়েছে- এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশন আরও নিরাপদ করার পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

ঘণ্টায় ৮ হাজার ৭০০ কিলোমিটার গতিতে আঘাত
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, ফ্যালকন-৯ রকেটের পরিত্যক্ত উপরের অংশটি বুধবার চাঁদের পৃষ্ঠে ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কিলোমিটার (প্রায় ৫ হাজার ৪০০ মাইল) বেগে আঘাত হানে।

সংঘর্ষের মুহূর্তে একটি ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলক তৈরি হলেও সেটি এতটাই ক্ষীণ ছিল যে উন্নত মানের টেলিস্কোপ দিয়েও অধিকাংশ অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীর পক্ষে তা দেখা সম্ভব হয়নি।

তবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি বৃহৎ মানমন্দির সংঘর্ষের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করছে। গবেষকদের মতে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল জানতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

কীভাবে চাঁদের পথে গেল রকেটটি?
ফ্যালকন-৯ স্পেসএক্সের পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট। এর মূল অংশ পৃথিবীতে ফিরে এলেও কিছু অংশ মহাকাশেই থেকে যায়।

রকেটটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এর মাধ্যমে দুটি চন্দ্রযানকে পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে পাঠানো হয়েছিল।

মিশন সফল হওয়ার পর রকেটের উপরের অংশটি আর প্রয়োজন হয়নি। প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান আকারের এবং কমপক্ষে ৪ হাজার কেজি ওজনের এই অংশটি মহাকাশে দীর্ঘ উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরতে থাকে।

পরবর্তী প্রায় ১৮ মাস ধরে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং সূর্যালোকের সামান্য বিকিরণচাপ ধীরে ধীরে এর গতিপথ পরিবর্তন করে।

রকেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পরে বুঝতে পারেন, এসব ক্ষুদ্র প্রভাব মিলেই সেটিকে ধীরে ধীরে চাঁদের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং প্রতিদিনই এর গতি বাড়ছিল।

কেন সরাসরি দেখা যায়নি সংঘর্ষ?
বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী বুধবার সংঘর্ষের সময় বিশ্বের অনেক অঞ্চলে দিনের আলো ছিল। ফলে সংঘর্ষের সময় তৈরি হওয়া ক্ষীণ আলোর ঝলক দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল।

যদিও রাতের আকাশে পর্যবেক্ষণ করা কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীর পক্ষে কয়েক মিনিট স্থায়ী প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ধুলার মেঘ দেখার সম্ভাবনা ছিল, তবে সেটিও খুব সীমিত।

চাঁদকে প্রদক্ষিণরত মহাকাশযানগুলোর কোনওটিই ঠিক সেই সময়ে সঠিক অবস্থানে ছিল না।

দক্ষিণ কোরিয়ার ডানুরি অরবিটার ঘটনাস্থলের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে এর গবেষক দল জানিয়েছে, তথ্য বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার পরই সম্ভাব্য ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হবে।

অন্যদিকে, নাসার লুনার রিকনাইস্যান্স অরবিটার (এলআরও) আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ঘটনাস্থলের ছবি তুলবে। সংঘর্ষের আগে ও পরের ছবি তুলনা করে নতুন ক্রেটারের আকার ও আশপাশের পরিবর্তন নির্ণয় করা হবে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দুর্ঘটনা?
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি আসলে একটি বিরল ‘নিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক পরীক্ষা’।

কারণ গবেষকদের কাছে রকেটটির আকার, ওজন, গতি এবং কোথায় আঘাত হানবে- সব তথ্যই আগে থেকে জানা ছিল।
ফলে এটি সাধারণ উল্কাপিণ্ডের মতো অনিশ্চিত সংঘর্ষ নয়; বরং এমন একটি ঘটনা, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তাদের তাত্ত্বিক মডেল বাস্তব তথ্য দিয়ে যাচাই করতে পারবেন।
এতে জানা যাবে-
• সংঘর্ষে কীভাবে নতুন ক্রেটার তৈরি হয়;
• কত দূর পর্যন্ত শিলা ও ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়ে;
• চাঁদের অভ্যন্তরে কী ধরনের কম্পন সৃষ্টি হয়;
• ভূপৃষ্ঠের নিচে থাকা শিলাস্তরের বৈশিষ্ট্য কী।

ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটি নির্মাণেও কাজে লাগবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘর্ষে উড়ে যাওয়া শিলা ও ধুলাবালির পরিমাণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে চাঁদে নিরাপদ অবতরণস্থল নির্বাচন সহজ হবে।

এছাড়া চাঁদে স্থায়ী গবেষণা কেন্দ্র বা মানব বসতি নির্মাণের সময় আশপাশে সংঘর্ষজনিত ধ্বংসাবশেষ কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং ভূমি কতটা কাঁপতে পারে- সেসব বিষয়ও নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের নিচ থেকে উঠে আসা নতুন শিলার নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা চাঁদের ভূতত্ত্ব এবং প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী-চাঁদ যুগলের সৃষ্টি সম্পর্কে নতুন তথ্য পেতে পারেন।

চাঁদে মানবসৃষ্ট বস্তুর আঘাত নতুন নয়
এটি প্রথম ঘটনা নয়। ১৯৫৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ডজনখানেকের বেশি মানবসৃষ্ট মহাকাশযান বা রকেটের অংশ চাঁদে আছড়ে পড়েছে। এর কিছু ছিল দুর্ঘটনা, আবার অনেকগুলোই ইচ্ছাকৃতভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পরিচালিত হয়েছিল।

চাঁদে প্রথম আঘাত হানে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা-২ মহাকাশযান।

এরপর ১৯৬০-এর দশকে নাসার রেঞ্জার মহাকাশযান, অ্যাপোলো যুগের কয়েকটি রকেটের ধাপ এবং ২০০৯ সালে এলসিআরওএসএস (LCROSS) মিশন পরিকল্পিতভাবে চাঁদে আঘাত করে। ওই মিশনের লক্ষ্য ছিল চাঁদে পানির বরফের উপস্থিতি অনুসন্ধান করা।

সবশেষ নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষ ঘটে ২০২২ সালে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, ২০১৪ সালে উৎক্ষেপিত চীনের একটি চন্দ্র মিশনের পরিত্যক্ত বুস্টার চাঁদে আঘাত করেছিল।

মহাকাশে বাড়ছে ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত ছয় দশকের বেশি সময়ে পৃথিবীর কক্ষপথ ও চাঁদের আশপাশে বিপুল পরিমাণ মহাকাশ আবর্জনা জমা হয়েছে।

স্পেসএক্সের এই রকেটের সংঘর্ষ সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, মহাকাশে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত রকেট বা যন্ত্রাংশ ভবিষ্যতে শুধু ঝুঁকিই তৈরি করে না; কখনও কখনও সেগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যও অমূল্য সুযোগ এনে দিতে পারে। সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর