
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : সোনাইমুড়ী উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় করা মামলায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার এজাহার, আহত ব্যক্তি ও সাক্ষীদের বক্তব্য এবং পরিবারের দাবি পর্যালোচনা করে তাঁর গ্রেপ্তারের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রিফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন। তবে অনুসন্ধানে মামলার এজাহারে নাম থাকা কয়েকজন সাক্ষী ও গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির বক্তব্যে ঘটনার সময় রিফাতকে ঘটনাস্থলে দেখার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন কিশোরকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশ কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে?
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুন রাতে নোয়াগাঁও চৌরাস্তা এলাকায় ২০ থেকে ২৫ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি হামলা চালায়। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণ ও এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের অভিযোগ করা হয়। এতে কয়েকজন আহত হন।
এজাহারে নাঈম হাসানের হাঁটুতে গুলি লাগা এবং আশিকসহ কয়েকজন আহত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একই ঘটনায় মোটরসাইকেল ও দোকান ভাঙচুর এবং টাকা লুটের অভিযোগও করা হয়েছে।
ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় কয়েকজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে রাকিবুল ইসলাম ফিরোজ, নাঈম হাসান, আশিক, নাহিদ, আকাশ, মনির, ফয়েজ ও দোকানদার রুবেলসহ কয়েকজনের নাম সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাঁদের মধ্যে আহত ব্যক্তি ও স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য নেওয়া হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রিফাতকে তাঁরা ঘটনাস্থলে দেখেননি। হামলাকারীদের মধ্যে রিফাত ছিল এমন নির্দিষ্ট তথ্যও তাঁরা দিতে পারেননি বলে জানা গেছে।
পুলিশ রিফাতকে শনাক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ছবি দেখিয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে ওই ছবি দেখে রিফাতকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তি হিসেবে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার বিষয়ে
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট তথ্য রিফাত উপস্থিত ছিল না এই বলে দাবি করেছেন এ মামলার সকল সাক্ষী ।
তবে এসব বক্তব্যের পাশাপাশি পুলিশের হাতে থাকা অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ কী, তা তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে যাচাইয়ের বিষয়।
রিফাতের পরিবারের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গভীর রাতে সোনাইমুড়ীর দেওটি ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রিফাতের বাবা আফাজ উদ্দিন বলেন, আমার ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। ঘটনার পর থেকে সে বাড়িতেই ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
পরিবারের ভাষ্য, রিফাতকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ একটি ছবি এবং হেলমেট পরা এক ব্যক্তির ছবি দেখিয়ে সেটি রিফাত বলে দাবি করেছিল। তবে ওই ছবি কোথা থেকে পাওয়া, কখন ও কোথায় ধারণ করা হয়েছে এবং ছবির ব্যক্তিটি আদৌ রিফাত কি না এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিবার।
পরিবারের আরও দাবি, রিফাতকে গ্রেপ্তারের পর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হলেও কোনো অস্ত্র, বিস্ফোরক বা অপরাধসংশ্লিষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে পুলিশের জব্দ তালিকা ও তদন্ত নথিতে কী রয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
মামলার আহত ব্যক্তি ও মামলার বাদী স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য, গোলাগুলির ঘটনায় প্রকৃতভাবে যারা জড়িত, তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।
তাঁদের অভিযোগ, ঘটনার প্রকৃত অভিযুক্তদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও নিরপরাধ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ কারণে সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য আলামত যাচাই করে আসামি শনাক্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে অনুসন্ধানে এই প্রশ্ন থেকে যায় রিফাতকে কি কোনো গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি বা মামলার সাক্ষী সরাসরি শনাক্ত করেননি ?সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি ?
তাঁর কাছ থেকে কোনো অস্ত্র, ককটেল বা অপরাধসংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার হয়েছে হয়নি ?
ঘটনার সময় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে মোবাইল ফোনের লোকেশন, কল ডেটা বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি ?
এজাহারে হামলাকারীদের অনেকের মুখ ঢাকা থাকার অভিযোগ থাকলে তাঁদের শনাক্তকরণ কীভাবে করা হয়েছে এই প্রশ্নটি থেকেই যায় ?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিরপরাধ কাউকে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে হয়রানি বা গ্রেপ্তার না করাও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, তদন্তে রিফাতের ঘটনাস্থলে উপস্থিতি ও ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষীদের বক্তব্য ও অন্যান্য আলামতও তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।
তবে রিফাতের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তদন্তে পুলিশের হাতে থাকা প্রমাণ, সাক্ষীদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত আদালতে উপস্থাপন এবং যাচাইয়ের পরই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
১৭ বছর বয়সী রিফাতের ক্ষেত্রে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি, শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া এবং তদন্তে সংগৃহীত প্রমাণ স্বচ্ছভাবে যাচাই ও আদালতে উপস্থাপন করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গোলাগুলি, ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীরা যাতে আইনের আওতায় আসে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
আপনার মতামত লিখুন :