
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : সোনাইমুড়ীর জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চার লাখ টাকার বিনিময়ে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপার অভিযোগ উঠেছে। নিহত মোঃ পারভেজ উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের আন্দিরপাড় এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে। গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে এই ঘটনা ঘটে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা লেনদেনের বিষয়টি নিহতের বাবা নিশ্চিত করেছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, বাদশা মিয়া মুন্সি বাড়ীর নিহত পারভেজ ১৫ বছর থেকে প্রবাসে গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করতেন। তার ৮ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। কিছুদিন পূর্বে তিনি কাতার থেকে দেশে ফেরেন। গলার টনসিল অপারেশনের জন্য শুক্রবার বিকালে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হন। রাত ১০টার দিকে রোগীকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলেও অপারেশন ছাড়াই সাড়ে ১০টার দিকে তাকে মৃত অবস্থায় বের করা হয়।
নিহতের বাবা মোঃ বাবুল জানান, তার ছেলেকে ওটিতে নেওয়ার কিছু সময় পর সেই রুমে থেকে চিকিৎসক কিশোর কুমার হালদার বের হয়ে যান। এর কিছু সময় পর ডাঃ ফারজানা আক্তার রুমা ওটি থেকে মাস্ক-পরা অবস্থায় বেরিয়ে যান। তার কিছু সময় পর অপারেশন থিয়েটারে থাকা ওয়ার্ড বয় ও আয়া বাইরে এসে ছোটাছুটি করতে থাকে। এর কিছু সময় পর জানানো হয় রোগীকে দ্রুত আইসিউতে নিতে হবে। ছেলেকে যখন ওটি থেকে বের করা হয় তখন তার শরীর ছিল একেবারে ঠান্ডা। পরে ইসিজি করে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরো জানান, ময়নাতদন্ত ছাড়াই সোনাইমুড়ী থানা থেকে তিনটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ছেলের লাশ তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেওটি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তাকে আইনি ঝামেলা এড়াতে সমঝোতার পরামর্শ দেন। পরে শনিবার লাশ দাফন শেষে রবিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ফখরুল ইসলাম লিটনের হাত থেকে চার লাখ টাকা গ্রহণ করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ওই ঘটনার সময় অপারেশন থিয়েটারে ওটি বয় হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন রাকিব ও রুবিনা আক্তার। এনেস্থেসিয়া দিয়েছিলেন হাসপাতালের গাইনী চিকিৎসক ও সনোলজিষ্ট ডাঃ ফারজানা আক্তার রুমা। আর সার্জন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ কিশোর কুমার হালদার।
হসপিটাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চিকিৎসক সহকারী আব্দুল মোতালেব জানান, পারভেজ বেশ স্বাস্থ্যবান ছিলেন। ওটি রুমে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে তাকে কিছু ইনজেকশন পুশ করা হয়। এর পরপরই তার শরীর ঘেমে অক্সিজেন লেভেল কমতে থাকে। কিছু সময়ের ভেতরে রোগী মারা যায়। এছাড়া লেনদেন হওয়া টাকার নির্দিষ্ট অংকটি প্রতিবেদকের কাছে প্রকাশ না করলেও অর্থ প্রদানের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তবে কোন ত্রুটি না থাকলে কোন উদ্দেশ্যে ভুক্তভোগীদের এই টাকা দেওয়া হলো এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বর্ণনায় ওটি রুমের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে ওই সময়ে অপারেশন থিয়েটারে উপস্থিত থাকা ওটি বয় রাকিব ও রুবিনা আক্তার কিংবা এনেস্থেসিয়া প্রদানকারী চিকিৎসক ডাঃ ফারজানা আক্তার রুমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন প্রতিবেদক। তবে হাসপাতালে তাদের পাওয়া যায়নি। পরে তাদের মুঠোফোন নাম্বার চাইলেও তা দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া আব্দুল মোতালেব নিশ্চিত করেন তাদের হাসপাতাল বাদেও উপজেলা ও জেলা শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে অপারেশন রোগীকে ডাঃ ফারজানা আক্তার (রুমা) এনেস্থেসিয়া দেওয়ার কাজ করে থাকেন।
তবে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রচারিত বিজ্ঞাপনে ডাঃ ফারজানা আক্তারকে একজন মা, শিশু ও গাইনী রোগে অভিজ্ঞ এবং সোনালজিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি জরায়ুর টিউমার, মাসিকের অনিয়ম, এবং প্রসূতি সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসা ও সার্জারি (যেমন: সিজার বা অন্যান্য গাইনী অপারেশন) করার যোগ্যতা রাখেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এনেস্থেসিয়া দেওয়ার কাজটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং এটি একজন এনেস্থেসিওলজিস্ট বা অবশকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দায়িত্ব।
এক্ষেত্রে একজন গাইনী চিকিৎসক দিয়ে কিভাবে রোগীকে এনেস্থেসিয়া দেওয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা হলো সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে।
ঘটনার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচার হলে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রিয়াজ উদ্দিন রাশেদ। তিনি জানান, এই ঘটনায় তাদের কাছে কোন অভিযোগ করা হয়নি। তবে সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই হাসপাতাল ও সেখানের ডাঃ ফারজানা আক্তারে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটিতে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
সোনাইমুড়ী থানার ওসি মোঃ কবির হোসেন বলেন, ‘এবিষয়ে লিখিত কোন অভিযোগ করা হয়নি। আর্থিক লেনদেনর বিষয়টি তার জানা নেই।’
স্থানীয়রা জানান, এই হাসপাতালটি পূর্বে মেডিকেয়ার হসপিটাল নামে পরিচালিত হতো। সেসময়ও নানা অভিযোগ ছিলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এক্সরে করা অবস্থায় মেশিন পড়ে রোগী আহতের ঘটনায় উপজেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
আপনার মতামত লিখুন :