
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : সোনাইমুড়ীতে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় সিভিল সার্জনের নির্দেশে তদন্ত করছে তিন সদস্যের কমিটি। এখনো চুড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি তদন্ত কমিটি। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পূর্বেই তদন্ত কমিটির এক সদস্যের বরাতে সংবাদ প্রকাশ করেছে কিছু ভুঁইফোঁড় অনলাইন পোর্টাল। তদন্ত কমিটির ওই সদস্যের দাবি- ‘তিনি এমন কোন মন্তব্য করেননি।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদটি প্রচার করার পর বিরুপ মন্তব্য করছেন নেটিজেনরা। অনেকে এই ভুঁইফোড় পোর্টালের সাংবাদিকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকার কাছে বিক্রি হয়ে এমন ভুয়া সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে।
জানা যায়, গত ৭ আগস্ট (শুক্রবার) রাতে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে গলার টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে অপারেশন থিয়েটার মৃত্যু হয় মোঃ পারভেজ নামে এক প্রবাস ফেরত যুবকের। নিহত পারভেজ উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের আন্দিরপাড় এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে।
ওই ঘটনায় থানায় মামলা কিংবা হাসপাতালের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ না করার শর্তে চার লাখ টাকার বিনিময়ে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নিহতের বাবা বাবুল মিয়া ও নিহতের স্ত্রী নিশু আক্তারের থেকে সোনাইমুড়ী থানা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়। নিহতের লাশ কাঁটাছেড়া করে পোস্টমর্টেম করা হবে, মামলার খরচ ও হয়রানির ভয়ভীতি দেখিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে টাকা লেনদেন ও সাদা কাগজে ভুক্তভোগী পরিবারের স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রকাশ পাওয়ার পর আলোচনায় আসে বিষয়টি।
এই ঘটনায় নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা: আনোয়ার হোসেনের স্বপ্রণোদিত ভাবে এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে তদন্তের নির্দেশ দেন। সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইসরাত জাহানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আর এমও ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিন হাসপাতালের এনেস্থেশিয়া বিভাগের চিকিৎসক ডা. শফিক। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে তদন্ত শেষ না হতেই তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আর এম ও) ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিনের বরাত দিয়ে কিছু ভুঁইফোঁড় পোর্টাল ও ফেসবুক পেইজে তদন্তের বিষয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে। সেখানে প্রচার করা হচ্ছে ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিনের বলেছেন, “প্রাথমিক তদন্তে জমিলা হাসপাতালের ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে কোন চিকিৎসা ও এনেস্থেসিয়া দেয়নি। রোগী অস্থির হয়েই মৃত্যুবরণ করে।”
তবে প্রকাশিত সংবাদের বক্তব্যটি তার নয় বলে দাবি করেছেন ডা. রিয়াজ উদ্দিন। তিনি জানান, ওই বক্তব্যটি ছিল ওটিতে থাকা অভিযুক্ত চিকিৎসক ও নার্সদের, যা তদন্ত কমিটির বক্তব্য হিসেবে বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে।
রিয়াজ উদ্দিনের ভাষ্যমতে, “হাসপাতাল কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা দাবি করেছিল—অপারেশন শুরু করা হয়নি, কোনো অ্যানাস্থেসিয়াও দেওয়া হয়নি, রোগী অস্থির হয়ে মারা যায়। এটি শুধুই তাদের মুখের কথা ছিল, আমাদের তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়।”
তিনি আরো বলেন, অনেকেই ফোন দিয়েছেন তদন্তের বিষয়ে জানতে। সকলকেই বলা হয়েছে তদন্ত চলমান রয়েছে। শেষ হলে কমিটির প্রধান বিস্তারিত জানাবেন।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে কথা হয়, সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইসরাত জাহানের সাথে। তিনি বলেন, তদন্তের কাজ শেষ হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবার ও ওটিতে থাকা চিকিৎসক, নার্সদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত দ্রুতই শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। পরে তদন্তের বিস্তারিত সাংবাদিকদের জানানো হবে।
উল্লেখ্য, জমিলা মেমোরিয়ালে যুবকের মৃত্যুর ঘটনার পরে হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। ডাঃ মো. মাইনুল ইসলাম বলেন “অপারেশন থিয়েটারে ঢুকানোর আগেই মাত্রা অতিরিক্ত ভয় ও চিন্তার কারণেই পারভেজ স্ট্রোক করে মৃত্যু বরণ করে।” এই সংবাদ প্রচারের পরে ওই প্রতিবেদক ও ডাঃ মো. মাইনুল ইসলামকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
আপনার মতামত লিখুন :