প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারি, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ৪ জানুয়ারি, ২০২৪

এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলেন উপজেলা সভাপতি

উপজেলা প্রতিনিধি, বেগমগঞ্জ : নৌকায় ভোট দিলে ভোটারদের চেঁচি (পিষে) ফেলার ঘোষণা দেওয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যাহ এবার উল্টো উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের নৌকার প্রার্থী মামুনুর রশীদ কিরনকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করলেন। বুধবার (৩ জানুয়ারি) বিকেলে বেগমগঞ্জের নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন তিনি। এসময় সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ডা. এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি, আক্তার হোসেন ফয়সল, মিনহাজ আহমেদ জাবেদ, এম,এ কাশেম সহ অনেকে নোয়াখালী -৩ বেগমগঞ্জ আসনে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়নের জন্য আবেদন করি। দলীয় সভানেত্রীর মনোনয়ন বোর্ড মামুনুর রশিদ কিরন সাহেবকে মনোনয়ন প্রদান করেন। পরবর্তীতে সভানেত্রী সারাদেশ ব্যাপি মনোনয়ন প্রত্যাশিদের কে গণভবনে ডেকে নেন। আসন্ন নির্বাচন সমন্ধে বিস্তারিত আলোচনা শেষে মনোনয়ন বিষয়ে বলেন যে, ২৯৮ আসনে তিনি মনোনয়ন দিয়েছেন কিন্তু মনোনয়ন প্রত্যাশী যারা ছিলো জাতীয় নির্বাচনকে অর্থবহ, প্রতিযোগীতা মূলক ও আনন্দ মুখর করার জন্য যে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন। এতে দলের কোনো আপত্তি থাকিবে না।

তিনি আরও বলেন, বিগত নির্বাচনের মতো বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় কেউ নির্বাচিত না হওয়ার জন্য হুশিয়ার করা হয়েছে। কারন এতে দেশে এবং বিদেশে সুষ্ঠ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সে অনুযায়ি দলীয় সভা নেত্রীর পরামর্শ মোতাবেক আমরা তিন জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মিনহাজ আহমেদ জাবেদ সাহেবকে সমর্থন করেছি। এতে দলের গঠনতন্ত্র বিরোধী কোনো কর্ম আমরা করেনি এবং সভানেত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করছি।

নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর আমরা কখনো দল ও দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে কোন বিষোধগার করিনি। উপরন্তু আমরা দল ও প্রতীকের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছি। সাধারন ভোটারদের অভিব্যক্তি অনুযায়ি আমরা নৌকার প্রার্থীর যোগ্যতা ও বিগত দশ বছরের উনার উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিষয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু সর্বত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি।

মামুনুর রশীদ কিরন নানা অপকর্ম করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামুনুর রশীদ কিরন ২০০৮ সালে নৌকার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী হয়ে নৌকাকে ডুবিয়েছে এবং কৌশলে বিএনপির প্রার্থী বরকত উল্যাহ বুলুকে জয়ী হতে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। ২০২১ সালে দলীয় প্রধান কর্তৃক মনোনীত চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র আক্তার হোসেন ফয়সালের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী করে উনার ভাই অযোগ্য প্রার্থী সাইফুল্ল্যাহকে মেয়র বানান । বর্তমানে মেয়র সাইফুল্ল্যাহ পৌরসভায়, ঘুষ, দুর্নীতি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করেছেন।

সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাড় করিয়ে নৌকার ভরাডুবি করেন। উপজেলার সকল টেন্ডার টি.আর কাবিখা উনি উনার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে কমিশনের ভিত্তিতে বিলি বন্টন করেন। যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উনার বিরুদ্ধে বিরূপ জনমত তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, চৌমুহনী হকার্স মার্কেটের সভাপতির বিরুদ্ধে মন্দির ভাঙ্গার মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেপ্তার করিয়ে মামুনুর রশীদ নিজে সভাপতি হয়ে মার্কেটের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেন। সর্বশেষ বিখ্যাত চৌমুহনী বড় মসজিদের সভাপতি হয়ে এবং উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতা সামছুল হক সামসু কে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক করে উনি সহ মসজিদের তহবিল হতে ৩ কোটি বিশ লাখ টাকা তছরূপ করলে মুসল্লিদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। যা বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক ভাবে প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন আলেম ওলামাগণ উক্ত নেক্কার জনক ঘটনার বিরুদ্ধে ওয়াজে বিষেদাগার করেন। এতে করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের তথা স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের মারাত্বক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। একজন ধর্মপ্রান মুসলমান হিসেবে উল্লেখিত বিষয়টি মেনে নিতে পারিনা।

আওয়ামী লীগকে কলঙ্ক মুক্ত করতে চাই উল্লেখ করে এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, আমরা আওয়ামীলীগকে কলঙ্ক মুক্ত করার জন্য মসজিদের টাকা তছরূপের দায়ে গতকাল উপজেলা আওয়ামীলীগের কার্যকরী কমিটির সভায় সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ কিরন এবং সহ-সভাপতি সামসুল হক সামসু কে উপজেলা আওয়ামীলীগে অবাঞ্চিত ঘোষণা করিলাম এবং স্থায়ী বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা আওয়ামীলীগ ও দলীয় সভানেত্রী বরাবর অনুলিপি প্রেরণ করলাম।

ভাইরাল হওয়া বক্তব্যের বিষয়ে এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, আমি সাত তারিখ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে আছি। তারপর ভোট শেষে আমি আবার আমার জায়গায় থাকবো। সবাইকে নিয়েই আমাদের আওয়ামী লীগ থাকবে। কাদিরপুর ইউনিয়নে যে বক্তব্য দিয়েছি তা নৌকার বিপক্ষে বলিনি। আমার বক্তব্যকে ভুল ভাবে প্রচার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে চৌমুহনী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন ফয়সাল, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, কাদিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত ৮টার দিকে বেগমগঞ্জ বিসিক শিল্প এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের নৌকার প্রার্থী মামুনুর রশীদ কিরণ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যাহসহ ১৫ জন নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

অব্যাহতি পাওয়া নেতারা হলেন, বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এ বি এম জাফর উল্যাহ, সহ-সভাপতি মাহফুজুল হক বেলাল, সামসুল হক সামসু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন আজীম, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক মোরশেদ আলম, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ইমাম হোসেন রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক শরাফ উদ্দিন বাবু, সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এড এ বি এম ইউসুফ আশিক, সদস্য ও চৌমুহনী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন ফয়সল, সদস্য শাহজাহান সাজু, হায়দার জাফর হাবিব, মেহেদি হাসান টিপু ও দাউদ উল্যা হিল মজিদ।

প্রসঙ্গত, গত ১জানুয়ারি (সোমবার) বিকেলে কাদিরপুর ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতিকের মিনহাজ আহমেদ জাবেদের এক উঠান বৈঠকে নৌকায় ভোট দিলে ভোটারদের চেঁচি (পিষে) ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যাহ। ৪৩ সেকেন্ডের এই বক্তব্য নিয়ে ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এসময় তিনি বলেন, আজকে কাদিরপুর ইউনিয়নের গণসংযোগের শেষ দিন। সমাপনী দিনে আপনাদের বলছি কাদিরপুরের একটা লোক যদি ডান বাম করেন তাদের খেদাই (তাড়িয়ে) দেবেন। যেগুলো নৌকায় ভোট দেবে মনে করবেন তাদের কাদিরপুর থাকার অধিকার নাই। তাড়িয়ে দেবেন এখান থেকে। দুই একটা কালসাপ আছে। এদের চিহ্নিত করে নির্বাচনের দিন চেঁচি (পিষে) দেবেন। এসময় স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের মিনহাজ আহমেদ জাবেদ, চৌমুহনী পৌরসভার সাবেক মেয়র আক্তার হোসেন ফয়সাল অর্থনীতিবিদ ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ এফসিএ, কাদিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর