• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

সোনাইমুড়ীতে খোলা ভাগাড়ে পৌর ও চিকিৎসা বর্জ্য: বিষাক্ত ধোঁয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
সোনাইমুড়ী-চাটখিল আঞ্চলিক মহাসড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সোনাইমুড়ী পৌরসভার একটি অস্বাস্থ্যকর ময়লার ভাগাড়। পাহাড়ি টিলার মতো উঁচু হয়ে থাকা বর্জ্যের স্তুপে নিয়মিত আগুন দেওয়ায় ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকছে আশপাশের জনপদ। দুর্গন্ধ, বিষাক্ত ধোঁয়া, মশা-মাছির উপদ্রব এবং চিকিৎসা বর্জ্যের সংক্রমণঝুঁকিতে বছরের পর বছর মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে তারা এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। একাধিকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও মেলেনি স্থায়ী সমাধান।
উপজেলার নদনা ইউনিয়নের পূর্ব কালুয়াই এলাকায় মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এই ভাগাড়ের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ইলিয়াস ভূইয়া বাড়ির বাসিন্দারা। বাড়িটিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী অন্তত ছয়টি শিশু রয়েছে, যারা ডায়রিয়া, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চুলকানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. অনিক বলেন, বাড়ির পাশে ময়লা ফেলা শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা নিয়মিত অসুস্থ হচ্ছি। গত দুই-তিন বছরে শুধু ডায়রিয়ায় আমাদের পরিবারের তিনজন মারা গেছেন। একই বাড়ির সালমা আক্তার বলেন, আমার ৬ মাসের বাচ্চা আছে। ময়লায় আগুন দিলে দম বন্ধ হয়ে আসে, বাচ্চার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। দুর্গন্ধ আর মাছির কারণে ঘরে থাকা দায় হয়ে গেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে সোনাইমুড়ী পৌরসভা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সার্ভ বাংলাদেশ লিমিটেড’ এর সঙ্গে বর্জ্য অপসারণে চুক্তি করে। সর্বশেষ ২০২২ সালে চুক্তি নবায়ন করা হয়। মাসিক এক লাখ টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি পৌর এলাকার বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব পালন করছে।

তবে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কাজ করলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই প্রতিষ্ঠানটির। অভিযোগ রয়েছে, পৌর এলাকার পাঁচটি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ করে সাধারণ ময়লার সঙ্গে খোলা স্থানে ফেলা হচ্ছে। ফলে রক্তমিশ্রিত ব্যান্ডেজ, সুচ, গজ, তুলা ও অন্যান্য সংক্রমণশীল বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রখর রোদে ঘন ধোঁয়ার মধ্যেই কয়েকজন শ্রমিক ভ্যান থেকে ময়লা নামাচ্ছেন। তাদের কারও শরীরে নেই ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম । পরিচ্ছন্ন কর্মী সাইনুর রহমান জানান, মাসিক বেতন মাত্র ৬ হাজার টাকা। বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের বাবদ অতিরিক্ত যে অর্থ পান, তার একটি বড় অংশ সুপারভাইজারকে দিতে হয়। আরেক কর্মী আমিন আলি বলেন, উপজেলার হাসপাতাল ও সব ক্লিনিকের বর্জ্য আমরা আনি। কিন্তু কোনো প্রশিক্ষণ বা সুরক্ষা পোশাক দেওয়া হয়নি।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মাসিক বেতনের বাইরে বাসাবাড়ির ময়লা বাবদ পাওয়া অর্থ থেকেও ৭ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত সুপারভাইজারের হাতে তুলে দিতে হয়।

‘চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮’ অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্স থাকতে হবে। এছাড়া বর্জ্য পরিবহনে লিকেজ-মুক্ত বিশেষ কাভার্ড ভ্যান, ইনসিনারেটর বা অটোক্লেভ এবং কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, চিকিৎসা বর্জ্য সাধারণ ময়লা পরিবহনের ভ্যানেই আনা হচ্ছে এবং খোলা জায়গায় ফেলে আগুন দেওয়া হচ্ছে।
এতে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ভয়াবহ বায়ুদূষণ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার আওতাধীন প্রায় ৪০টি হোটেল থেকে মাসে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা এবং প্রতিটি বাসা থেকে ৬০ থেকে ১০০ টাকা করে ময়লা বাবদ আদায় করা হচ্ছে। অন্যদিকে পৌর করের আওতায় কঞ্জারভেন্সি বিলও নেওয়া হচ্ছে। ফলে একই সেবার জন্য পৌরসভা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উভয় পক্ষের মাধ্যমে নাগরিকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
সোনাইমুড়ী পৌরসভার সেনেটারি ইন্সপেক্টর সামসুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ‘সার্ভ বাংলাদেশ লিমিটেড’ বর্জ্য অপসারণের কাজ করছে। কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানকে দেখতে হবে।

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা উপ-পরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি বলেন, “সার্ভ বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেনি। অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা বর্জ্য পরিবহন বা ব্যবস্থাপনা করতে পারে না। তাদের লিখিত নোটিশ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরিন আকতার বলেন,পৌরসভার ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টের কাজ চলছে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ব্যবস্থায় চলবে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য আমরা দুঃখিত, কিন্তু আপাতত অপারগ।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর