
একটি সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নারী-পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর নিরাপত্তা ও অগ্রযাত্রার পথে অন্যতম বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ইভটিজিং’ বা পথচলতি সম্ভ্রমহানি ও হয়রানি। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র এবং ইন্টারনেট জগৎ—কোথাও আজ নারীরা এই ব্যাধি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। এটি কেবল কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। পত্রপত্রিকায় প্রতিদিন ইভটিজিং ও নারীনির্যাতনের যেসব খবর প্রকাশিত হয়, তা আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত তাড়িত করে।
সমস্যার ভয়াবহতা: সময়ের সাথে সাথে ইভটিজিং ও হয়রানির ধরন এবং ভয়াবহতা বহুগুণ বেড়েছে। একসময় যা কেবল শিষ দেওয়া, আপত্তিকর মন্তব্য বা ইশারা-ইঙ্গিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন শারীরিক লাঞ্ছনা, সাইবার বুলিং (অনলাইন হয়রানি) এবং ব্ল্যাকমেইলের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এবং গবেষণায় এই সমস্যার গভীরতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে:
জাতিসংঘের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান: জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন উইমেন’ (UN Women) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর যৌথ বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে ২ জনই (প্রায় ৬৬%) তাঁদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি কিংবা ইভটিজিংয়ের শিকার হন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেন্দ্রিক বিশেষ ক্রোড়পত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকগুলোতে এই তথ্য বারবার উঠে এসেছে।
জাতীয় জরুরি সেবা (৯৯৯) এর তথ্য: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই ৩২,৩৮৬ জন নারী পথঘাটে ও অনলাইনে সহিংসতা এবং হয়রানির শিকার হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের জরুরি সহায়তা নিয়েছেন। এই সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ২৬,৭৯৮ এবং ২০২৪ সালে ছিল ২৩,০৩৩—যা স্পষ্ট করে যে নারীদের এই উত্ত্যক্তকরণের হার কতটা ঊর্ধ্বমুখী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর জরিপ: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) কর্তৃক ১৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিবাহিত নারীদের প্রায় ৭৬% (প্রতি ৪ জনে ৩ জন) তাঁদের জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সামাজিক জড়তা ও লোকলজ্জার কারণে ৬২% ভুক্তভোগী নারী তাঁদের সাথে ঘটে যাওয়া এই মানসিক বা শারীরিক লাঞ্ছনার কথা পরিবার বা অন্য কাউকেও বলতে পারেন না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রতিবেদন: দেশের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর বার্ষিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পথঘাটে বখাটেদের ক্রমাগত ইভটিজিং, কুপ্রস্তাব এবং এর ফলে সৃষ্ট মানসিক ট্রমা সহ্য করতে না পেরে প্রতি বছর দেশে গড়ে ১৫০ থেকে ১৭০ জন নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকে আসক-এর এই চোখ কপালে তোলার মতো পরিসংখ্যানটি প্রকাশিত হয়।
সাইবার ইভটিজিং বা ডিজিটাল হয়রানি: সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে ইভটিজিং এখন ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী কিশোরী ও তরুণীদের একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০% থেকে ৭০%) অনলাইনে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, ফেক আইডি বা ইনবক্সে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
ইভটিজিংয়ের পেছনের কারণসমূহ: এই সামাজিক ব্যাধি রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে কাজ করছে বহুমুখী সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষার অভাব: সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠনে পারিবারিক শিক্ষার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। পরিবার থেকে যদি নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে তরুণ সমাজ সহজে দিকভ্রান্ত হয়।
আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগের অভাব: ইভটিজিং বিরোধী আইন থাকলেও অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া অন্যদের এই অপরাধে উৎসাহিত করে।
সামাজিক উদাসীনতা: আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ এখনো ইভটিজিংকে ‘তুচ্ছ’ বা ‘তরুণ বয়সের ছ্যাবলামি’ বলে এড়িয়ে যায়। অপরাধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অধিকাংশ মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, যা বখাটেদের সাহস আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমাধানে করণীয়: ইভটিজিং নামক এই অন্ধকার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ।
১. পারিবারিক সচেতনতা ও মূল্যবোধের চর্চা: প্রতিটি পরিবারকে তাদের কন্যাসন্তানের পাশাপাশি পুত্রসন্তানকেও সমান নৈতিক শিক্ষায় বড় করতে হবে। নারীকে ভোগ্যপণ্য নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে সম্মান করার পাঠ শুরু হতে হবে ঘর থেকেই।
২. আইনের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ: ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের (যেমন: দণ্ডবিধি ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন) কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনাকীর্ণ এলাকাগুলোতে। একই সাথে সাইবার বুলিং বা ডিজিটাল হয়রানিরোধে সাইবার নিরাপত্তা আইনের কঠোর ও তাৎক্ষণিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. সামাজিক প্রতিরোধ ও সম্মিলিত কণ্ঠস্বর: বখাটেদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো নারী হয়রানির শিকার হলে আশপাশের মানুষকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদী ভূমিকা নিতে হবে। এলাকায় এলাকায় সচেতন নাগরিকদের নিয়ে ‘ইভটিজিং প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।
৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে জেন্ডার সচেতনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব নিয়ে কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন করা জরুরি। এখানে বড়দের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোর ও তরুণদেরও এগিয়ে এসে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘরের বাইরে অনিরাপদ রেখে আমরা কোনোভাবেই একটি আধুনিক বা উন্নত রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি না। বিবিএস, জাতিসংঘ সহ উল্লেখ করা বিভিন্ন পরিসংখ্যানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইভটিজিং কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই ব্যাধিকে রুখতে হবে। তাই এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হয়ে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে এবং কাজ করতে হবে । আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের কন্যা, বোন ও মায়েদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর এবং মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, মহাস্থান মাহীসওয়ার কলেজ বগুড়া, কবি ও প্রাবন্ধিক।
আপনার মতামত লিখুন :