প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অসম্পূর্ণ খালেই চূড়ান্ত বিল: ৩০ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ার অভিযোগ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে

জেলা সংবাদদাতা, লক্ষ্মীপুর : নথিপত্রে উঠে গেছে কাজের শতভাগ অগ্রগতি, আর সরকারি কোষাগার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৩০ লাখ ৩ হাজার ৫৩৬ টাকার পুরো বিল। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, খালের বুক জুড়ে জমে আছে এক দশকের কালচে পলি ও ময়লা-আবর্জনা।

খালের পাড় বাঁধানো কিংবা খননের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি তো নেই-ই, এমনকি খালের স্থায়িত্ব রক্ষা বা পরিমাপের জন্য আবশ্যকীয় বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামোর একটিরও অস্তিত্ব মেলেনি। কোনো প্রকার সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এই অসম্পূর্ণ কাজের চূড়ান্ত বিল অনুমোদন করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫/২৬ সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন (আইপিসিপি) প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ‘পি টু ডি’ খাল (০.০০ মিটার থেকে ১০৯৫.২৭ মিটার) এবং ‘পি টু ডি ১/১’ খালের (০.০০ মিটার থেকে ২৩৯৭.৬০১ মিটার) সংস্কারসহ বেড ব্লক ও টিবিএম অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। টেন্ডার আইডি ১০৭০৪২৭-এর বিপরীতে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আম্মার ট্রেডার্স’। লোকদেখানো সামান্য কিছু কাজ করে শুরুতে প্রথম চলতি বিল বাগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে বিতর্কিত প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন সদর উপজেলায় যোগ দেওয়ার পরপরই শুরু হয় মূল কারসাজি। সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই অনৈতিক সুবিধা পকেটে পুরে অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে চূড়ান্ত বিল পাস করে দেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে চরম জালিয়াতির চিত্র। হামছাদী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল লতিফ হাজীবাড়ি থেকে মিরশাহ্ আলম চেয়ারম্যান বাড়ি পর্যন্ত ১৫০০ মিটার (১.৫ কিলোমিটার) অংশে কোনো প্রকার খননকাজই করা হয়নি। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান বাড়ির উত্তর থেকে সুলতান ভূঁইয়া বাড়ি পর্যন্ত ১ কিলোমিটার অংশে খালের তলদেশ খনন না করে শুধুমাত্র ভাসমান ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেই খননকাজ সম্পন্ন হিসেবে দেখিয়েছেন প্রকৌশলী ইকবাল।

এ ছাড়া চৌধুরী বাড়ি থেকে কালভার্ট পর্যন্ত মাত্র ১০০ মিটার অংশ খালের দুই মুখে লোকদেখানো সামান্য পরিষ্কার করা হলেও মাঝখানের বিস্তৃত মূল অংশ সম্পূর্ণ অছোঁয়া রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত এই সরকারি প্রকল্পের কোনো সুফলই পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।

শুধু মাটি কাটাই নয়, চরম অনিয়ম ও জালিয়াতি করা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণেও। খালের স্থায়িত্ব রক্ষা, তলদেশের ক্ষয়রোধ এবং সঠিক লেভেল বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট চেইনেজে মাটির নিচে আরসিসি বা পিসিসি দিয়ে বেড ব্লক ও পরিমাপের জন্য টিবিএম স্থাপনের বাধ্যবাধকতা ছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে ৯টি বেড ব্লক এবং ১৮টি টিবিএম নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে একটিরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, এমনকি গভীরতা মাপার কোনো স্থায়ী চিহ্ন বা খুঁটিও বসানো হয়নি। অথচ প্রকৌশলী ইকবাল এসব দুর্নীতির তথ্য গোপন করে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে বিলে অনুমোদন দেন।

প্রকল্পের নামে এমন লুটপাটে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল রাজ্জাক বলেন, খালে সামান্য মাটিও কাটা হয়নি। বর্ষায় পানি নামতে না পেরে আগের মতোই জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে আমাদের। অথচ এখন শুনছি কাজের সব টাকা নাকি ঠিকাদার আর প্রকৌশলী ইকবাল মিলে তুলে নিয়েছেন।

দুর্নীতির এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন চরম উদাসীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ দেখিয়ে বলেন, ফাইনাল বিল দেওয়া হয়েছে কি না, তা নথি না দেখে বলা সম্ভব নয়। পরে আসেন, তখন বিষয়টি খতিয়ে দেখব।

তবে এলজিইডি লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চূড়ান্ত বিল প্রস্তুত করা হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী কিছু টাকা আটকে (হ্যান্ডআপ) রেখেছেন। অনিয়মসংক্রান্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, বিতর্কিত প্রকৌশলী ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। এর আগে লক্ষ্মীপুরে উন্নয়ন কাজের বিল ছাড়াতে ‘৫ শতাংশ’ কমিশন আদায়, অসম্পূর্ণ ভবনে ৩৩ কোটি টাকার শতভাগ বিল পরিশোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের একাধিক অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এসব অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে ফেনীর পরশুরামে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এক অদৃশ্য শক্তির বলে মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় পরশুরাম থেকে চন্দ্রগঞ্জ এবং এর মাত্র ৬ দিনের মাথায় পুনরায় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় পদায়ন বাগিয়ে নেন তিনি। শাস্তির বদলে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে তিন উপজেলায় বদলি হয়ে পুনরায় স্বপদে বহাল থাকার এই ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ নিয়ে এলজিইডির ভেতরে-বাইরে এখন তীব্র তোলপাড় চলছে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর