
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : নদী ও সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জেলেরা। ঘাটে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা রয়েছে নৌকা ও ট্রলার। কেউ অলস সময় কাটাচ্ছেন, কেউ আবার নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন। আয়-রোজগার বন্ধ থাকলেও থেমে নেই সংসারের খরচ। ফলে চাল-ডাল কেনা, সন্তানদের পড়াশোনা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি খাদ্যসহায়তার ভিজিএফের চাল প্রকৃত জেলেদের অনেকে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের দাবি, তালিকায় অজেলেদের নাম থাকলেও বাদ পড়ছেন অনেক প্রকৃত জেলে।
হাতিয়ার বিভিন্ন মাছঘাট ও উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদী-সাগরে মাছ ধরার স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য নেই। নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও মাছ ধরতে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে জেলেদের। অনেকে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে এনজিওর ঋণের কিস্তি ও দোকানের বাকি পরিশোধের চাপ তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।
জাহাজমারা ইউনিয়নের কাদিরার ঘাটের নুরুল আলম মাঝি বলেন, “ঝড়-তুফান সহ্য করে সাগরে মাছ ধরি। সরকার নিষেধাজ্ঞা দিলে আইন মেনে নৌকা ঘাটে বেঁধে রাখি। কিন্তু মাছ না ধরলে ঘরে চুলা জ্বলে না। সরকার যে চাল দেয়, অনেক প্রকৃত জেলে তা পান না। পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।”
বুড়িরচর ইউনিয়নের সূর্যমুখী মাছঘাটের সোলতান মাঝি বলেন, মাছ ধরতে না পারায় আয় বন্ধ। অথচ এনজিওর কিস্তি ও দোকানের বাকি পরিশোধ করতে হচ্ছে। আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর দাবি, প্রকৃত জেলেদের তালিকা যাচাই করে খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
চরঈশ্বর বাংলা বাজার মাছঘাটের রিয়াদ অভিযোগ করেন, সরকারি সহায়তার চাল বিতরণে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁর দাবি, যারা নিয়মিত সাগরে মাছ ধরেন, তাঁদেরই যেন সহায়তার তালিকায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
চেয়ারম্যান ঘাটের রহমত মাঝিও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাঁদের উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে যায়। ভিজিএফের চাল পর্যাপ্ত নয়, আবার অনেকে তা থেকেও বঞ্চিত হন। তালিকা সঠিকভাবে যাচাই করে প্রকৃত জেলেদের সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলেরা জানান, মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে এ সময়ে পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা দিতে ভিজিএফের চাল সুষ্ঠুভাবে বিতরণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, স্বচ্ছভাবে তালিকা প্রণয়ন করা হলে প্রকৃত জেলেদের বঞ্চনা কমবে।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বলেন, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি ও প্রজনন সুরক্ষায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জেলেদের খাদ্যসহায়তার জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণ চলছে।
তিনি আরও বলেন, তালিকা থেকে কোনো প্রকৃত জেলে বাদ পড়েছেন কি না কিংবা অজেলেদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি সহায়তা প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্টরা তৎপর রয়েছেন।
নদী ও সাগরনির্ভর হাতিয়ার জেলেদের দাবি, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার সময় সঠিকভাবে সরকারি সহায়তা বিতরণ ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না হলে ঋণের চাপে অনেক জেলে পরিবারকে আরও দুর্ভোগে পড়তে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :