• ঢাকা
  • শনিবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

নির্বাচন ও ব্যালটে হাদীর প্রভাব: রাজনীতি কোন পথে? ড. মাহরুফ চৌধুরী

বাংলাদেশের গণমুখী ও নৈতিক দায়ের নতুন এক রাজনৈতিক ধারার উত্থান ও বিকাশে শহীদ ওসমান হাদীর প্রভাব আজ আর অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি যে রাজনৈতিক ভাষার প্রচলন ও গণসংযোগ অনুশীলনের সূচনা করেছিলেন, তা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে পরিবর্তনের আশায় উদ্বুদ্ধ এক গণঢেউ তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি পূর্ণতা পাওয়ার আগেই তাঁর শাহাদাত বরণ কেবল একজন নেতাকে হারানোর বেদনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা দেশজুড়ে পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর গণমানুষের মনে এক গভীর ও বেদনাবহ শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাষ্যকারের মতে, এই শূন্যতা ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকেও প্রবলভাবে আলোড়িত ও পুনর্বিন্যাসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাধারণভাবে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট আবেগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু ওসমান হাদীর ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক পথরেখা যেন ব্যতিক্রমী রূপ ধারণ করেছে। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তাঁর শাহাদাতের পর ঢাকার কেন্দ্রে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জানাজা-সমাবেশ কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং প্রতীকী অর্থেও সেটা ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের মতে, এমন সমাবেশ নাগরিক সমাজের ভেতরে জমে থাকা ন্যায়বোধ ও বঞ্চনার সমষ্টিগত বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দেয়। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, মাস পেরিয়েও এই আবেগ ক্ষয় হয়নি এখনো। বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর খুনের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিটি ক্রমেই আরও উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে এই দাবি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে, যা চাপা ক্ষোভের রূপ লাভ করছে। হাদীর খুনের বিচারের দাবি কোনো দলীয় শোক নয়; বরং এটা গণমানুষের এক বিস্তৃত নৈতিক ও আইনি অধিকারের প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, অধিকাংশ শহীদের মৃত্যু সাধারণ মানুষের মনে প্রথমে তীব্র শোক তৈরি করলেও সময়ের প্রবাহে সেই শোক সীমিত গোষ্ঠীর আবেগে পরিণত হয়। কিন্তু হাদীর শাহাদাত সেই পরিচিত ছক ভেঙে দিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর অভিঘাত আত্মীয়স্বজন বা রাজনৈতিক অনুরাগীর বৃত্তে আবদ্ধ থাকেনি; বরং তা জাতির সামষ্টিক স্মৃতিতে এক অম্লান চিহ্ন হিসেবে গেঁথে গেছে। এই শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গৌরব—ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক অবস্থানের গৌরব, যা গণমাধ্যমের জগৎ থেকে হাওয়া হয়ে গেলেও এখনো জাতীয় জীবনের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে ‘হজম’ হয়ে যায়নি। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এমন অনাহজম করা স্মৃতিই দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আচরণ ও দলহীন ভোটারদের ভোটের মনোভাবকে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, হাদীর উত্থান এবং তাঁর নিহত হওয়ার পর তৈরি সামাজিক-রাজনৈতিক আবহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক স্বতন্ত্র মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে গভীর গণস্পর্শী চরিত্র ছিল, তারই প্রতিফলন আমরা এই স্থায়ী আলোড়নে দেখতে পাই। তাই বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান গতিধারায় আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ঘটনাপ্রবাহকে নিছক একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে না দেখে ‘হাদীর প্রভাব’ (হাদী ইফেক্ট) হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত। এই প্রভাব আসন্ন নির্বাচন ও রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল হলেও তা উপেক্ষা করা যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আগ পর্যন্ত শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন জাতীয় রাজনীতির পরিমণ্ডলে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত এক নাম। কিন্তু জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পরপরই তিনি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন এক ভিন্নধারার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাঁর কণ্ঠস্বর প্রচলিত প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে সহজেই মিশে যায়নি; বরং তার সীমা ও ভণ্ডামিকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এই দৃশ্যমানতা কোনো কৃত্রিম প্রচারণার ফসল ছিল না; বরং তা ছিল সমকালীন সংকটে জমে থাকা ক্ষোভ ও গণঅনুভূতির সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের স্বাভাবিক সংযোগের পরিণতি। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে হাদী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ ও সামাজিক ‘অচলায়ন’ ভাঙতে তাঁর প্রচেষ্টা শুধু বক্তৃতা বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুক্তিনির্ভর তর্ক এবং শ্রদ্ধাশীল ভঙ্গিতে নানা রাজনৈতিক নেতা ও দলের রাষ্ট্র অথবা গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা তাঁকে অন্যদের থেকে পৃথক করেছে। বিশেষত অনাবৃত ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি যেভাবে গণমানুষের দাবিগুলো উচ্চারণ করতেন, তা দেশের আপামর মানুষের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলেছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি ছিল ‘প্রতিনিধিত্বের শূন্যতা’ পূরণে ভালোবাসাতাড়িত প্রত্যয়ননির্ভর এক অনানুষ্ঠানিক প্রয়াস, যেখানে নাগরিকরা নিজেদের কথা শোনার মতো এক বিশ্বাসযোগ্য মুখ খুঁজে পেয়েছিল।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে অভিবাসিত হাদীর সামাজিক পরিচয়ও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাজনের বিচারে তিনি ছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান; শিক্ষাজীবনে মাদ্রাসা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার সমন্বয় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে দিয়েছে একাধিক আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের অন্তর্দৃষ্টি। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি অসাধারণভাবে নিজেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষায় প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। আবার শিক্ষক হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্বেগও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে লাখো মানুষের কাছে তাঁর বক্তব্য ‘বাইরের কারও’ নয়; বরং একেবারে ‘আপনজনের’ কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছিল। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় সেটি এক ধরনের আবেগগত বিশ্বাসযোগ্যতা (অ্যাফেক্টিভ ক্রেডিবিলিটি) তৈরি করে। সে কারণে রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কৌশলের দিক থেকেও হাদী ছিলেন ব্যতিক্রমী। তিনি সচেতনভাবেই কোনো প্রতিষ্ঠিত বড় রাজনৈতিক দলের ছায়ায় অবস্থান নেননি; বরং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে সমাজের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবলয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। এতে একদিকে তিনি প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যেতে পেরেছেন, অন্যদিকে জনগণের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও মধ্যস্থতাহীনভাবে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর তাঁর ভূমিকা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখনই, যখন তিনি আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে মোকাবিলা করার জন্য নানা পন্থা, প্রক্রিয়া ও কর্মকাণ্ড উদ্ভাবন ও প্রয়োগে সক্রিয় হন। এটি ছিল কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক বলয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার সচেতন প্রয়াস।

লক্ষ্যণীয় যে, হাদীর বার্তা ছিল ভাষায় সহজ ও সরল, কিন্তু অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে জমে থাকা গণক্ষোভের প্রতিফলনে তা কখনো কখনো রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এই রুক্ষতা ব্যক্তিগত আক্রোশের ফল নয়; বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক মনোবৃত্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের ভাষাগত প্রকাশ। সাহিত্য ও রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, হাদীর বক্তব্য সেই মুহূর্তে এক ধরনের ‘কথ্য প্রতিরোধ’-এ রূপ নেয়, যেখানে শব্দই হয়ে ওঠে ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার। তাই তাঁকে দৃপ্ত কণ্ঠে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের গালিই হচ্ছে মহাকাব্য’। এই কারণেই তিনি কেবল একজন বক্তা বা আন্দোলনকর্মী নন; বরং সময়ের রাজনৈতিক আবেগকে ধারণ করা এক প্রতীকী চরিত্রে পরিণত হন। হাদীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে নিছক প্রতিবাদী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর ভূমিকার মৌলিক দিকটি আড়াল হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল দায় ও দরদের সমাজ গঠনে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য নেতৃত্ব নির্মাণ এবং একই সঙ্গে গণমুখী এক বিকল্প সাংস্কৃতিক বলয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার সচেতন প্রয়াস। তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন এমন একটি পরিসর হিসেবে, যেখানে মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে বিকল্প সাংস্কৃতিক চর্চার পক্ষে মত, পথ ও পরিবেশ তৈরি করা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল সংস্কৃতিকে ক্ষমতার আনুষঙ্গিক অনুষঙ্গ হিসেবে নয়; বরং নাগরিক জীবনের অন্তর্গত অধিকার হিসেবে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা।

ওসমান হাদীর দৃষ্টিতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক নীতিগত প্রভাব সাধারণ মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে বিকৃত এবং দমন করে রেখেছে। ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মাধ্যমে তিনি সেই চাহিদাকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন, যাতে মানুষ নিজের ভাষা, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের অপেক্ষা ছাড়াই প্রকাশ করতে পারে। সাংস্কৃতিক তত্ত্বের ভাষায়, এটি ছিল ‘হেজেমনি’ ভাঙার এক প্রাত্যহিক প্রয়াস, যেখানে সংস্কৃতি ক্ষমতার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদার মাধ্যম। তবে স্বার্থের হোলি খেলায় মত্ত প্রথাগত রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে তাঁর এই পথচলা সহজ ছিল না। সহযোদ্ধাদের রাজনৈতিক অপরিপক্বতা, অদূরদর্শিতা এবং কারও কারও ক্ষেত্রে নৈতিক ও কৌশলগত পথভ্রষ্টতা হাদীকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, কেবল আন্দোলন বা সাংস্কৃতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন টেকসই হয় না। ফলে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি মূলধারার রাজনীতিতে বিকল্প পথের নজির উপস্থাপনের জন্য সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়; বরং গণমুখী আন্দোলনের অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার এক বাস্তববাদী প্রয়াস।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে হাদী রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নকে সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে নির্বাচন ছিল কেবল বিজয় বা পরাজয়ের হিসাব নয়; বরং এটি ছিল প্রতীকী উপস্থিতি তথা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোড়ন সৃষ্টি করে একটি গণমুখী দায় ও দরদের নতুন বন্দোবস্তের দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি ছিল ‘প্রতীকী রাজনীতি’র এক সচেতন প্রয়োগ, যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণই হয়ে ওঠে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করা ও ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাতেও স্পষ্ট ছিল। প্রচলিত বিলবোর্ড, লিফলেট, বড় মোটরকেড বা ব্যয়বহুল প্রদর্শনীর বদলে তিনি বেছে নেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রানির্ভর মৌলিক ও স্বল্পসম্পদনির্ভর কৌশল, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমন্বয়। তিনি নির্দিষ্ট সময় বা স্থানের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। এই পদ্ধতি কেবল অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং এটি ছিল তাঁর রাজনীতির দর্শনেরই প্রতিফলন, যেখানে রাজনীতি মঞ্চকেন্দ্রিক নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেই অবস্থান করে।

ওসমান হাদীর জনপ্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তাঁর সততা, সত্যনিষ্ঠা ও নির্ভীকতার মতো সদগুণাবলি, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা রাঘববোয়াল তাদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্লভ। তিনি নিজেকে কেবল দুর্নীতিবিহীন ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেননি; বরং এক স্বচ্ছ রাজনৈতিক চরিত্রের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, যার জীবনাচরণ ও রাজনৈতিক ভাষার মধ্যে কোনো দৃশ্যমান ফাঁক ছিল না। ক্ষমতা ও সুবিধার সঙ্গে আপস না করার এই ধারাবাহিকতা জনমনে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ছিল ‘নৈতিক পুঁজি’ (মোরাল ক্যাপিটাল), যা অর্থ বা সংগঠনের শক্তি ছাড়াও একজন ব্যক্তিকে জনকেন্দ্রিক নেতৃত্বে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা সরকারি ও রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে—যাকে জনমনে দুর্নীতির প্রতীক হিসেবেই দেখা হতো—হাদী সচেতনভাবেই নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন প্রচলিত প্রথা-পদ্ধতি ও সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে। এই অবস্থান তাঁকে কেবল একজন ভিন্নমতাবলম্বী নয়; বরং ‘সাহসের প্রতীক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর নির্ভীক উচ্চারণ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমালোচনায় আপসহীনতা এবং ঝুঁকি জেনেও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভকে ভাষা দেয়। ফলে জনমনে তিনি হয়ে ওঠেছিলেন এক দৃঢ় ও আস্থাভাজন রাজনৈতিক চরিত্র, যার কণ্ঠে মানুষ নিজের ভেতরের কথাগুলো খুঁজে পেয়েছিল।

এই কারণেই শহীদ হওয়ার পরও হাদীর রাজনীতির ময়দানে স্বল্পকালীন সক্রিয় উপস্থিতির প্রভাব কর্পূরের মতো উবে যায়নি। সাধারণত রাজনীতিতে ব্যক্তিনির্ভর আবির্ভাব দ্রুত মিলিয়ে যায়, কিন্তু হাদীর ক্ষেত্রে আমরা উল্টো চিত্রটি স্পষ্ট দেখতে পাই। ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব, জনমনে তাঁর ধারণা, সাহসী কণ্ঠস্বর এবং অসমাপ্ত প্রচেষ্টা এক ধরনের স্থায়ী মানসিক ছাপ রেখে গেছে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি এক ‘অপূর্ণ কাজের প্রভাব’ (আনফিনিশড বিজনেস এফেক্ট), যেখানে অসমাপ্ত লড়াই মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি এখনো মীমাংসিত হয়নি। সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক অনুমতির অপেক্ষা না করে সত্য উচ্চারণের বার্তা এখনো মানুষের মনোজগতে গভীরভাবে সংরক্ষিত। এগুলো কেবল স্মৃতির অংশ নয়; বরং সামাজিক আচরণ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করার মতো শক্তিশালী ধারণায় পরিণত হয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের চলমান ইতিহাসে ওসমান হাদীর রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থায়িত্বের মূল ব্যাখ্যা নিহিত। তিনি ব্যক্তি হিসেবে আজ আমাদের মাঝে অনুপস্থিত হলেও তাঁর নৈতিক অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রতীকত্ব জনমনে এখনো সক্রিয় ও প্রাসঙ্গিক।

আসন্ন গণভোট ও সংসদ নির্বাচনে হাদীর প্রভাব কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পরিসরে আবদ্ধ থাকবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। হাদীর শাহাদাত বরণের পর থেকে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষ তাঁর জন্য ব্যথিত এবং তাঁর খুনের বিচারের দাবিতে উচ্চকিত। সাধারণ মানুষের মনে তিনি প্রবলভাবে দাগ কেটেছেন। ফলে তাঁর স্বল্পকালীন সরব উপস্থিতির এই প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ধরনের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশা নির্মাণ করছে, যেখানে নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতায় পৌঁছানোর কৌশল নয়; বরং দুর্নীতিহীনতা, সাহসিকতা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় ও স্বচ্ছ সংযোগের নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই মানদণ্ডটি ইতোমধ্যে জনমানসে প্রোথিত হতে শুরু করেছে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক আচরণকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই অর্থে ‘হাদীর প্রভাব’ (হাদী ইফেক্ট) আসন্ন নির্বাচনে ব্যালটের ফলাফল ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ—উভয়কেই বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ এটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে শুধু সংখ্যার হিসাব বা ভোটের খেল

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর