
রাজনীতি কেবল সংখ্যার পাটিগণিত নয় রাজনীতি হলো বিশ্বাস, ত্যাগ এবং দীর্ঘ সংগ্রামের এক অলিখিত মহাকাব্য। একটি জনপদ যখন দশকের পর দশক ধরে একটি আদর্শের পতাকা বুকে নিয়ে ঝড়-তুফান মোকাবিলা করে, তখন তাদের প্রত্যাশা থাকে কেবল বিজয় নয় বরং সেই বিজয়ে নিজেদের শ্রম ও ঘামের স্বীকৃতি। আজ বাংলাদেশের মানচিত্রে ‘নোয়াখালী’ কেবল একটি জেলার নাম নয়, এটি একটি রাজনৈতিক চেতনার দুর্গ। আজ সেই দুর্গের প্রহরীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের প্রিয় নেতা, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুয়ারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ দেড় দশক আপনি বিদেশের মাটিতে থেকে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন। সেই দুঃসময়ে যখন দেশের আকাশ ছিল স্বৈরশাসনের কালো মেঘে ঢাকা, তখন যে জনপদটি আপনার নামে স্লোগান দিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করেছে, তারা হলো নোয়াখালীবাসী। আজ রাষ্ট্র সংস্কারের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে নোয়াখালীর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের কর্মীরা একটি প্রশ্নই তুলছেন আমাদের দীর্ঘ ত্যাগ কি তবে কেবল ইতিহাসের ফুটনোট হয়ে থাকবে?
ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ চার নক্ষত্র
একটি মন্ত্রিসভা যখন গঠিত হয়, তখন সেখানে আঞ্চলিক ভারসাম্য ও যোগ্যতার সমন্বয় থাকা জরুরি। জেলা এমন চারজন সিংহহৃদয় নেতা উপহার দিয়েছে, যারা গত ১৬ বছরে এক মুহূর্তের জন্যও মাথানত করেননি।
বরকত উল্লাহ বুলু: রাজপথের অতন্দ্র প্রহরী
সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলু কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি সংকটে তৃণমূলের শেষ আশ্রয়স্থল। তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ত্যাগের গল্প নোয়াখালীর প্রতিটি ঘরে ঘরে। আন্দোলনের দিনগুলোতে তাঁর ওপর যে পরিমাণ বর্বরোচিত হামলা ও মামলা হয়েছে, তা যে কোনো মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। তাঁর পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঝড়। তবুও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। আজ যখন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল, তখন বরকত উল্লাহ বুলুর মতো একজন পরীক্ষিত ও দক্ষ নেতাকে বাইরে রাখা নোয়াখালীবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।
জয়নাল আবদিন ফারুক নির্ভীক কণ্ঠস্বর
সংসদীয় রাজনীতিতে যাঁর বাগ্মিতা শত্রু-মিত্র সকলের সমীহ আদায় করে নেয়, তিনি জয়নাল আবদিন ফারুক। রাজপথে পুলিশের বুটের তলায় পিষ্ট হয়েও যাঁর হাত থেকে দলের পতাকা খসেনি, সেই দৃশ্য কি আমরা ভুলে যেতে পারি? একজন সাবেক চিফ হুইপ হিসেবে তাঁর যে অভিজ্ঞতা, তা বর্তমান সংসদীয় কাঠামো পুনর্গঠনে অপরিহার্য ছিল। তাঁকে মন্ত্রিসভার বাইরে দেখা মানে হলো সেই রক্তাক্ত সংগ্রামের অবমূল্যায়ন করা।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আইনের শাসন ও রাজপথের সেতুবন্ধন
সুপ্রিম কোর্টের বারান্দা থেকে শুরু করে রাজপথের তপ্ত পিচ সবখানেই ব্যারিস্টার খোকন ছিলেন গণতন্ত্রের পাহারাদার। আইনি লড়াইয়ে তিনি যেভাবে নেতাকর্মীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তা নজিরবিহীন। একজন প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ এবং লড়াকু নেতা হিসেবে তাঁর অন্তর্ভুক্তি হতে পারত এই সরকারের জন্য একটি বড় শক্তি। নোয়াখালীর মানুষ আজ ভাবছে, মেধাবী ও ত্যাগী হওয়ার অপরাধেই কি তবে এই দূরত্ব?
মো. শাহজাহান তৃণমূলের অভিভাবক
দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে মো. শাহজাহান নোয়াখালীর প্রতিটি কর্মীকে আগলে রেখেছেন সন্তানের মতো। জেল-জুলুম যাঁকে দমাতে পারেনি, যাঁর আদর্শিক অবস্থান হিমালয়ের মতো অটল, তাঁকে ছাড়াই কি আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব?
অর্থনীতির চাকা ও রাজনীতির জ্বালানি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি অবগত আছেন যে নোয়াখালী বাংলাদেশের অন্যতম রেমিট্যান্সসমৃদ্ধ অঞ্চল। প্রবাসে থাকা হাজারো নোয়াখালীবাসী কেবল দেশের অর্থনীতি সচল রাখেন না, বরং দলের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে তারা ছিলেন আর্থিক ও নৈতিক শক্তির মূল স্তম্ভ। রাজধানী ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং সাপ্লাই চেইনে নোয়াখালীর মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। আন্দোলনের খরচ থেকে শুরু করে সামাজিক সুরক্ষা সবখানেই নোয়াখালীর প্রবাসীদের এবং ব্যবসায়ীদের ঘাম ঝরানো অর্থ ব্যয় হয়েছে। আজ যখন প্রাপ্তির সময় এলো, তখন এই অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক ত্যাগের সমন্বয় কেন মন্ত্রিসভায় প্রতিফলিত হলো না?
রাজনীতিতে আবেগ ও যুক্তির ভারসাম্য থাকতে হয়। যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ অনুভব করে যে তারা কেবল ভোটের মেশিন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সেখানে জন্ম নেয় ‘আঞ্চলিক অভিমান’। নোয়াখালীর মানুষ পদলোভী নয়, তারা মর্যাদকামী। তারা চায় না কোনো দয়া তারা চায় তাদের যোগ্য নেতাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারিত্ব।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা কর্মীরা যখন দেখে তাদের প্রিয় নেতারা মূল স্রোত থেকে দূরে, তখন তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এই নীরব কান্না দুর্বলতার লক্ষণ নয়, এটি চরম হতাশার বহিঃপ্রকাশ। প্রিয় নেতা তারেক রহমান, আপনি আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করছেন। আপনি জানেন, রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তৃণমূলের আস্থা। নোয়াখালী সেই আস্থার পরীক্ষায় গোল্ডেন প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে বারবার।
অভিভাবকের প্রতি শেষ আকুতি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ইতিহাস সাক্ষী অভিমানকে যদি যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়, তবে তা অপরাজেয় শক্তিতে রূপ নেয়। আর যদি উপেক্ষা করা হয়, তবে তা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে যা পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দেয়।
নোয়াখালীর মানুষ আপনার উত্তরের অপেক্ষায় আছে। তারা চায় না ক্ষমতার দম্ভ, তারা চায় স্বীকৃতির মর্যাদা। বরকত উল্লাহ বুলু, জয়নাল আবদিন ফারুক, ব্যারিস্টার খোকন কিংবা শাহজাহান এঁরা কেবল ব্যক্তি নন, এঁরা নোয়াখালীর কয়েক লক্ষ মানুষের আবেগের ধারক।
আমরা বিশ্বাস করি, আপনি আমাদের অভিভাবক। আপনি আপনার সন্তানদের অশ্রু উপেক্ষা করবেন না। রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল সমীকরণের মাঝেও আপনি ত্যাগের মূল্যায়ন করবেন এই আশায় আজও নোয়াখালীর প্রতিটি জনপদ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে।
একটি জনপদের কান্না কখনো বিফলে যায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নোয়াখালীর এই আর্তনাদ শুনুন। ত্যাগের মর্যাদা দিন, জনপদের অধিকার ফিরিয়ে দিন। কারণ, রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়া, আর সেই হৃদয়ে আপনি আগেই আসীন আছেন; এখন শুধু প্রয়োজন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত ও স্বীকৃতির।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথার
আপনার মতামত লিখুন :