
পুলিশের পোশাক শুধু বাহ্যিক পরিচয়ের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থার প্রতীক। তাই পোশাক পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়া নয়, বরং তথ্যভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া জরুরি। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের অভ্যন্তরে পোশাক নির্ধারণে দুই লাখের বেশি সদস্যের মতামত নিতে জরিপ শুরু হওয়া সেই প্রয়োজনীয়তারই ইঙ্গিত দেয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পোশাক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন ‘আয়রন’ রঙের ইউনিফর্ম অনুমোদন করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ের অনেক সদস্য শুরু থেকেই এ নিয়ে অস্বস্তির কথা জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করেছে, সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সাম্প্রতিক জরিপের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াতেও আগের পোশাকে ফেরার পক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থনের ইঙ্গিত মিলছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
এ বিতর্কে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কার্যকারিতা—রাতে দৃশ্যমানতা, দেশের আবহাওয়ার উপযোগিতা এবং অন্যান্য বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যের বিষয়গুলো কি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, প্রক্রিয়া—দরপত্র ও ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছিল কি? একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ১৪১ কোটি টাকার কাপড় কেনার কাজ পাওয়ার বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।
এছাড়াও রয়েছে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। পোশাক পরিবর্তনে বিপুল ব্যয়ের চেয়ে বাহিনীর আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণে বিনিয়োগ কি বেশি জরুরি নয়? পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে জোর দেওয়া সময়ের দাবি।
ঐতিহাসিকভাবে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন হয়েছে বিবেচনাপ্রসূত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ২০০৪ সালে প্রজ্ঞাপন ও গেজেটের মাধ্যমে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে নতুন নকশা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে আবহাওয়া, দৃশ্যমানতা ও বাহিনীগত স্বাতন্ত্র্য গুরুত্ব পেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় খাকি, পরে জলপাই ও নীল—প্রতিটি রঙের পেছনে ছিল কার্যকারিতা ও সময়ের প্রেক্ষাপটের বিবেচনা। সুতরাং পোশাক কেবল নকশা নয়; এটি ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিরও অংশ।
তবে এ বিতর্ককে শুধুই রঙের পছন্দ-অপছন্দে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পুলিশের প্রতি জনআস্থা নির্ভর করে তাদের আচরণ, দক্ষতা ও জবাবদিহির ওপর। পোশাকের রং বদলালেই সেই আস্থা তৈরি বা নষ্ট হয় না। আবার সদস্যদের মনোবল ও স্বাচ্ছন্দ্য উপেক্ষা করেও কার্যকর পুলিশিং সম্ভব নয়।
তাই চলমান জরিপ যদি সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক হয় এবং এর ফলাফল নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়িত হয়, তবে সেটিই হবে ইতিবাচক অগ্রগতি। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে—এই বিতর্ককে সংঘাতে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশে রূপান্তর করার। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, পেশাগত প্রয়োজন ও আর্থিক বাস্তবতা—এই তিনের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে দূরদর্শী পদক্ষেপ।
পুলিশের পোশাক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতীক; আর সেই প্রতীক নির্ধারণে স্বচ্ছতা, যুক্তি ও সংলাপই হওয়া উচিত প্রধান মানদণ্ড।
আপনার মতামত লিখুন :