প্রকাশিত: ১০ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১০ জুলাই, ২০২৬

টানা বর্ষণে হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত: পানিবন্দী অর্ধলক্ষ মানুষ, চরম দুর্ভোগ

উপজেলা সংবাদদাতা,​ হাতিয়া : টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বর্ষণ ও জোয়ারের পানির যৌথ থাবায় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখন পানির নিচে। ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় উপজেলার অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। গ্রামীণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও বাজারঘাট তলিয়ে যাওয়ায় দ্বীপের স্বাভাবিক জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক ঘরের চুলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন দুর্গতরা।

​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও জাহাজমারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং হাতিয়া পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ডে থৈ থৈ করছে পানি। বহু ঘরবাড়িতে এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি।মাত্র কয়েকদিন আগেও যেখানে গবাদিপশু চরে বেড়াত, আজ সেখানে নৌকা চলছে।” – সাহাব উদ্দিন, বাসিন্দা (জাহাজমারা ইউনিয়ন)

​ভারী এই বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। আমন মৌসুমের শুরুতে বিস্তীর্ণ এলাকার বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া শত শত পুকুর ও মাছের ঘের উপচে চাষের মাছ ভেসে গেছে। কৃষকদের শঙ্কা, দ্রুত পানি না নামলে চলতি মৌসুমে আমন চাষাবাদ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

​যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে স্কুলগামী শিশুরা।সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং কাদা জমে থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

পশ্চিম মাইজচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছায়েদুল ইসলাম মিঠু জানান, কাদা ও পানি মাড়িয়ে নারী শিক্ষক ও ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন।

​স্থানীয়দের অভিযোগ, ভৌগোলিক কারণের চেয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অপরিকল্পিত বাধার কারণেই এই কৃত্রিম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

হাতিয়ার ছোট-বড় খালগুলোতে অবৈধভাবে বেহুন্দী জাল পেতে রাখায় পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারছে না।

উপজেলার প্রায় ২০টি সুইসগেটের অধিকাংশেরই ডালা বন্ধ বা অকার্যকর থাকায় পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

​সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি আহসান হাবীব রুবেল অবিলম্বে এসব জাল অপসারণ এবং সুইসগেটগুলো সচল করতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

​আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় নিম্নচাপের প্রভাবে আরও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দ্বীপবাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

​দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া পদক্ষেপগুলো হলো উপজেলার ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় জরুরি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

​ দুর্গত এলাকাগুলোতে শুকনো খাবার ও সরকারি ত্রাণ পৌঁছানো শুরু হয়েছে।

​হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রাসেল ইকবাল জানান, “হাতিয়া নদীবেষ্টিত হওয়ায় কিছু এলাকায় পানি নিষ্কাশন ধীরগতিতে হচ্ছে, যার ফলে সাময়িক এই জলাবদ্ধতা। তবে অধিকাংশ এলাকার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

প্রতি বছরের এই চেনা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় বাসিন্দারা কেবল সাময়িক ত্রাণ নয়, বরং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর