প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৩০ জুলাই, ২০২৬

আঁধার তাড়ানো আলোর খোঁজে- কবির কাঞ্চন

আঁধার তাড়ানো আলোর খোঁজে

কবির কাঞ্চন

আমরা মানুষ—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। জন্মের মুহূর্তে আমরা কিছুই জানি না, কাউকে চিনি না। এক অচেনা পৃথিবীতে এসে প্রথমেই কান্নায় ভেঙে পড়ি। সেই কান্নাই যেন পৃথিবীর উদ্দেশে আমাদের প্রথম ভাষা—আমি কিছুই জানি না, জানতে চাই; আমি কাউকে চিনি না, চিনতে চাই; আমি বড় অসহায়, আমাকে আগলে রাখো।

শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের পথে এগোতে এগোতে অজানাকে জানার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা আমাদের অন্তরে জন্ম নেয়। সেই আকাঙ্ক্ষার হাত ধরেই আমরা পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও প্রকৃতির কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখতে থাকি। এই নিরবচ্ছিন্ন শেখার প্রক্রিয়াই হলো শিক্ষা।

যে আলো আঁধার দূর করে, সেই আলোই পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়। সেই আলোরই আরেক নাম শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে। এটি আমাদের জীবসত্তা থেকে প্রকৃত মানবসত্তায় উত্তরণের পথ দেখায়। শিক্ষা শুধু বই পড়া কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করার বিষয় নয়; শিক্ষা আমাদের সত্যকে ধারণ করতে, সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে এবং কল্যাণের পথে চলতে শেখায়। তাই মানুষের জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব আকাশের সূর্যের মতোই অনিবার্য ও অপরিসীম।

জন্মের পর আমাদের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। মা-বাবার স্নেহ, আপনজনের ভালোবাসা, আদর্শ ও উপদেশের মধ্য দিয়ে আমরা শিষ্টাচার, ভদ্রতা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার প্রথম পাঠ গ্রহণ করি। এরপর বিদ্যালয়ে এসে আমরা প্রবেশ করি জ্ঞানের এক নতুন জগতে। শিক্ষকগণ আমাদের হাতে তুলে দেন আলোর প্রদীপ। অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত, শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর ভুবন আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। এই জ্ঞান আমাদের চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করে, কল্পনায় ডানা মেলে দেয় এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়।

শিক্ষা কেবল মস্তিষ্ককে সমৃদ্ধ করে না, হৃদয়কেও আলোকিত করে। সততা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়। আমরা উপলব্ধি করি, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ধন-সম্পদে নয়, তার চরিত্রে; তার কথায় নয়, তার কর্মে। তাই শিক্ষা মানুষকে শুধু বিদ্বান নয়, প্রকৃত অর্থে একজন সৎ, আদর্শ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থী যখন নিয়মিত অধ্যয়ন করে, নতুন কিছু জানার আগ্রহ লালন করে এবং নিজের দক্ষতা বিকাশে সচেষ্ট থাকে, তখন সে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। শিক্ষা তাকে সমস্যা সমাধান করতে শেখায়, সৃজনশীলভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নতুন কিছু সৃষ্টির সাহস জোগায়। ফলে সে নিজের জীবনকে যেমন সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে, তেমনি সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি শিক্ষিত জাতিই একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশের ভিত্তি। আজকের শিক্ষার্থীরাই আমাদের আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বিচারক, শিল্পী ও রাষ্ট্রনায়কসহ নানান পেশার যোগ্য উত্তরসূরি হবে। তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীর উচিত সময়ের মূল্য উপলব্ধি করা, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা, শিক্ষকদের সম্মান করা, নিয়মিত বই পড়া এবং সৎ কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা। শুধু পাঠ্যবই নয়, প্রকৃতি, সমাজ ও জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে আজীবন শিখতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শেখায়।

শিক্ষা এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা কোনো শক্তিই মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না। ধন-সম্পদ একদিন হারিয়ে যেতে পারে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে; কিন্তু অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৎ চরিত্র মানুষের চিরন্তন সম্পদ হয়ে থাকে। এই সম্পদই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, তার মর্যাদা এবং জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।

তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত শিক্ষার আলোকশিখা হৃদয়ে ধারণ করা। কারণ শিক্ষা শুধু একটি জীবনকে নয়, একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি জাতি এবং সমগ্র মানবসভ্যতাকে আলোকিত করে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষই পারে অজ্ঞতার আঁধার দূর করে একটি মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। শিক্ষা হোক আমাদের আত্মশক্তি, মানবতার ভিত্তি এবং একটি সুন্দর আগামী নির্মাণের অনন্ত প্রেরণা।

কবির কাঞ্চন
কবি ও গল্পকার
অধ্যক্ষ
বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর