
শাহরিয়ার আলম, নোবিপ্রবি : জালিয়াতি, তথ্যের অসংগতি, ভুয়া পিয়ার রিভিউ (বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং সাইটেশন কারচুপির মতো গুরুতর অভিযোগে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলো থেকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ১০টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম Retraction Watch এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সাময়িকীগুলোর প্রকাশনা ডাটাবেজ বিশ্লেষণে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকাশকদের তদন্তে গবেষণাপত্রগুলোতে ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, এআই-নির্ভর কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং কৃত্রিমভাবে উদ্ধৃতি (সাইটেশন) বাড়ানোর অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ২০২১-২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত নোবিপ্রবি-সংশ্লিষ্ট ১০টি গবেষণাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।
প্রত্যাহার হওয়া ১০টি গবেষণাপত্রের মধ্যে সাতটি মূল গবেষণা (রিসার্চ আর্টিকেল) এবং তিনটি পর্যালোচনা (রিভিউ আর্টিকেল)। এসব গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার নেচার, টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস, প্লস ওয়ান ও হিন্দাউইয়ের মতো বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থার জার্নালে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের চারটি (এর মধ্যে একটি পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের যৌথ), অর্থনীতি বিভাগের দুটি, ফার্মেসি বিভাগের দুটি, পরিসংখ্যান বিভাগের একটি এবং মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যৌথ একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডাটাবেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাতটি গবেষণাপত্রে তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, পাঁচটিতে ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ, চারটিতে সাইটেশন কারচুপি, তিনটিতে এআই বা কম্পিউটার-জেনারেটেড কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং একটি গবেষণাপত্রে ‘পেপার মিল’ ও তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফিশারিজ বিভাগের মাইক্রোপ্লাস্টিক, কোভিড-১৯ বর্জ্য দূষণ ও সামুদ্রিক কাঁকড়া বিষয়ক চারটি গবেষণাপত্র ভুয়া পিয়ার রিভিউ ও ডাটা ম্যানিপুলেশনের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব গবেষণায় বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. রিফাত জাহান রাকিবের নাম রয়েছে। একটি গবেষণায় পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক্সটার্নাল মেম্বার এম. সফিউর রহমানও সহলেখক ছিলেন। বর্তমানে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত না থাকলেও গবেষণাপত্রগুলোতে নোবিপ্রবির অ্যাফিলিয়েশন ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থনীতি বিভাগের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশবিষয়ক দুটি গবেষণাপত্র কম্পিউটার-জেনারেটেড লেখা ও অসংগতিপূর্ণ সাইটেশনের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে সহকারী অধ্যাপক লিটন চন্দ্র ভৌমিক এবং একটি গবেষণায় সহকারী অধ্যাপক মো. সাদ্দাম হোসেনের নাম রয়েছে।
ফার্মেসি বিভাগের স্নায়ুবিজ্ঞান বিষয়ক একটি রিভিউ আর্টিকেল পেপার মিল, তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ এবং কম্পিউটার-জেনারেটেড কনটেন্ট ব্যবহারের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে সহযোগী অধ্যাপক মো. শহীদ সারওয়ারের নাম রয়েছে। এছাড়া অ্যালঝেইমার রোগের চিকিৎসাবিষয়ক একটি গবেষণাপত্র পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে, যেখানে বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সিয়াম হোসেন যুক্ত ছিলেন।
ডেঙ্গু জ্বরবিষয়ক একটি গবেষণাপত্র তথ্য-উপাত্তের অসংগতি, ভুল উদ্ধৃতি ও অবিশ্বস্ত ফলাফলের কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার, অধ্যাপক মো. রাসেল হোসেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, প্রভাষক শরিফ হোসেন এবং শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) ভ্যাকসিনবিষয়ক একটি গবেষণাপত্র ভুয়া পিয়ার রিভিউ ও অবিশ্বস্ত ফলাফলের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শুভ চন্দ্র দাস এবং সাবেক শিক্ষার্থী মো. হাবিব উল্লাহ মাসুম সহলেখক ছিলেন।
একাডেমিক গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণাপত্র জালিয়াতি বা অনিয়মের অভিযোগে আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে গবেষণা প্রত্যাহার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সুনাম, গবেষকদের বিশ্বাসযোগ্যতা, বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন, দায় নিরূপণ এবং একাডেমিক সততা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, “গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি অনৈতিক এবং এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়। গবেষকদের এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক সততার বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে। বিষয়টি দ্রুত অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :