প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জমিলা মেমোরিয়ালের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সিভিল সার্জনের লুকোচুরি

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : সোনাইমুড়ীর জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুবকের মৃত্যুর চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত নিয়ে লুকোচুরি শুরু করেছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা: আনোয়ার হোসেন। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা যাবেনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। যুবকের মৃত্যুর ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির চুড়ান্ত প্রতিবেদন বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকেরা দেখলে চাইলে তিনি দেখাতে পারবেন না বলে অপারগতা প্রকাশ করেন। তদন্ত নিয়ে সরকারি কর্মকর্তার এমন লুকোচুরি সন্দেহের সৃষ্টি করছে।

সচেতন মহলের অভিযোগ, বেসরকারি হাসপাতালটির অনিয়ম ও চিকিৎসাজনিত অবহেলা ঢাকতে প্রতিবেদনের তথ্য গোপন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সম্প্রতি কাতার প্রবাসী পারভেজ নামের এক তরুণ সোনাইমুড়ীর জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অপারেশন থিয়েটারেই মারা যান। চিকিৎসাজনিত অবহেলার অভিযোগে স্বজনদের ক্ষোভের মুখে নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন।
তদন্তের ফলাফল ও হালনাগাদ জানতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে জেলা সিভিল সার্জন প্রতিবেদনটি সাংবাদিকদের দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এই প্রতিবেদন সাংবাদিকদের সরবরাহ করা যাবে না।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অভিযুক্ত জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোঃ মাইনুল ইসলাম বর্তমানে নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জনের সরাসরি প্রশাসনিক আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)-এর জুনিয়র লেকচারার। এর আগে তিনি সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) থাকা অবস্থায় দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে পদাবনতি পেয়ে ম্যাটসে বদলি হন। অন্যদিকে, গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরাও সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, যেখানে অভিযুক্ত ডা. মাইনুল একসময় প্রধান ছিলেন। সাবেক প্রশাসনিক প্রধান ও বর্তমান সহকর্মীর প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম আড়াল করতেই সিভিল সার্জন তথ্য গোপন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, রোগীকে কোনো অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন সিভিল সার্জন। এছাড়া ওটিতে নেওয়ার পর কার্ডিয়াক এরেস্টে রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও ধারনা পোষণ করেন তিনি। তবে কোন যুক্তিতে  তিনি এই কথা বলছেন এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

তবে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালের ট্রিটমেন্ট শিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৫ বছরের তরুণ পারভেজের অস্ত্রোপচারের পূর্বে ব্লাড প্রেশার, ওজন এবং রক্ত পরীক্ষা (CBC, RBS, S. Creatinine), ইসিজি (ECG) সহ প্রতিটি ল্যাব রিপোর্ট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক (ওকে) ছিল। অর্থাৎ রোগীর কার্ডিয়াক এরেস্ট হওয়ার কোন আলামত টেষ্টের রিপোর্টে ছিলো না।

ডা.আক্তার হোসেন অভি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ। জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালের ঘটনায় গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটিতে তিনিও সদস্য হিসেবে ছিলেন।

কথা হলে তিনি বলেন, “যেহেতু একটা রোগী মারা গেছে কোন না কোন ড্রাগস অবশ্যই প্রয়োগ হয়েছে। এমনি এমনি তো আর রোগী মারা যায়নাই। এখন একচুয়েলি কি ড্রাগস দেওয়া হয়েছে সেটা কমিটির সমন্বয় ছাড়া মন্তব্য করা যাবে না। প্রয়োজনে পোস্টমর্টেম করে ফরেনসিক রিপোর্ট আনতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, ”কোন না কোন ড্রাগস ব্যবহার হয়েছে। তবে ডাক্তার বলছেনা কোন ড্রাগস দিয়েছে। ডাক্তার বলছে কোন এনেস্থিসিয়া দেওয়া হয়নি। তবে আমার প্রশ্ন কোন এনেস্থিসিয়া দেওয়া না হলে রোগী হটাৎ  মারা গেলো কেনো? রোগীর মুখে যে টিউবটা ছিলো ওটা এনেস্থিসিয়ার আলামত। এটা এনেস্থেসিয়া দিলেই দেওয়া হয়।”

সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, ওটির সকল আলামত ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে ফেলা হয়েছে। তবে রোগীর হাতের ক্যানলা ও মুখে দেওয়া টিউব এনেস্থিসিয়া ব্যবহারের আলামত বলেও যুক্ত করেন তিনি।

এদিকে এই বিষয়ে জানতে, ঘটনার রাতে ওটিতে অ্যানেসথেসিয়ার দায়িত্বে থাকা ডা. ফারজানা আক্তার রুমার সাথে কথা বলতে ফোন দেওয়া হলে প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার সাথে সাথেই কল কেটে দেন।

তথ্য বলছে, হাসপাতালে ওই রাতে অস্ত্রোপচারের দায়িত্বে ছিলেন কনসালট্যান্ট ডা. কিশোর কুমার হালদার। এর আগেও ২০২৪ ফেনীর ‘ওয়ান স্টপ মেটারনিটি ক্লিনিকে’ নিশান নামের এক যুবকের টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে ঠিক একই ভাবে মৃত্যু হয় রোগীর। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য বিভাগ ক্লিনিকটি সিলগালা করে দেয়।

জমিলা মেমোরিয়ালের ঘটনার বিষয়ে কথা হলে তাকে প্রশ্ন করা হয়- ওয়ান স্টপ মেটারনিটি ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু আর জমিলা মেমোরিয়ালে পারভেজের মৃত্যু কি একই কারনে হয়েছিলো? তিনি বলেন, “হ্যাঁ দুটোই একই ধরনের ঘটনা এনেস্থিসিয়ার প্রবলেমের কারনে হয়েছে।”

তিনি জানান, এনেস্থিসিয়া চিকিৎসক যখন ওটিতে ছিলেন তখন তিনি নিজের চেম্বারে রোগী দেখছিলেন। পরে রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাকে ওটিতে ডাকা হয়। এর আগে রোগীকে কি মেডিসিন বা ড্রাগস দেওয়া হয়েছে তিনি তা জানেন না।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাক-অপারেশন রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকার পর ওটিতে মৃত্যুর ঘটনা ফৌজদারি গাফিলতি।  নোয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর(এডিশনাল পি.পি) এডভোকেট মোঃ মাহমুদ হাসান শাকিল জানান, স্পর্শকাতর এই মৃত্যুর তদন্ত প্রতিবেদন গোপন করা ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সিভিল সার্জন আইনগতভাবে এই তথ্য প্রকাশে বাধ্য।

সিভিল সার্জনের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এই লুকোচুরি জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। সোনাইমুড়ীর সচেতন মহল এই ঘটনায় সুষ্ঠ তদন্ত করে দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, তথ্য অধিকার আইনের ‘ক’ ফরম পূরণের মাধ্যমে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর